দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় সিলেটে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাঁদের বেশিরভাগই এখনও সরকারি ত্রাণ পাননি। বরাদ্দ অপ্রতুল হওয়ায় অনেক দরিদ্র মানুষ ত্রাণের অভাবে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আরেক বন্যাকবলিত জেলা সুনামগঞ্জেও ত্রাণের অভাবে দরিদ্র মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন। সেখানেও অপর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকায় বিতরণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। দুই জেলার বেশিরভাগ বন্যাকবলিত মানুষই ত্রাণ পাননি বলে জানান।

চলমান বন্যায় সিলেট জেলায় সরকারি হিসাবে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ। আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা আরও বেশি। প্রায় সবক'টি উপজেলা কমবেশি প্লাবিত হলেও সীমান্তবর্তী কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট উপজেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, ত্রাণ অপ্রতুল। তবে সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, পর্যাপ্ত বরাদ্দ রয়েছে।

সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম সমকালকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত সিলেট জেলার পানিবন্দি মানুষের জন্য সরকারিভাবে ৫৫১ টন চাল, নগদ ১৫ লাখ টাকা ও ১১ হাজার ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে উপদ্রুত এলাকার অসহায় মানুষের তুলনায় ত্রাণ বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল বলে অভিযোগ করেছেন ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা।

সোমবার সরেজমিন দেখা গেছে, জকিগঞ্জ উপজেলার উত্তর মাদারখাল গ্রামের কলিম উদ্দিন ও মনাফ উদ্দিনদের বাড়িঘরে এখনও পানি। তাঁরা জানান, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ঘরবাড়ি পানির নিচে। কিন্তু কেউ কোনো সাহায্য দেননি। সরকারি ত্রাণও পাননি।

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক। সিলেট সদরের বাইশটিলা এলাকা থেকে ছবিটি তুলেছেন ইউসুফ আলী

মাদারখালের আব্দুল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বরাদ্দ পাওয়া তো দূরের কথা, আজ পর্যন্ত কেউ তাঁদের খোঁজখবরও নেয়নি। উপজেলার ইসলামপুরের বাবুল আহমদের বাড়িও পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনিও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভোটের সময় সবাই আসে। বিপদে কাউকে পাওয়া যায় না। ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম-দুর্নীতির কথাও বলেছেন বিক্ষুব্ধ মানুষ।

সরকারি হিসাবে জকিগঞ্জ উপজেলায় ১ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। এখানে বিতরণের জন্য ৬২ টন চাল ও ১ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগেও কিছু ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। গত সাত দিনে ৩ হাজার ৬০০ পরিবারের মধ্যে ৩৬ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়।

গোয়াইনঘাটে ১৮ হাজার ৯৬০ পরিবারের ৯১ হাজার ৯৫৬ জন পানিবন্দি। সরকারি হিসাবের চেয়ে বাস্তবে অনেক বেশি মানুষ পানিবন্দি। এ উপজেলায় ৫৪ টন চাল ও ৩৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আরও ২২ টন চাল ও ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার রয়েছে।

তবে গোয়াইনঘাটের ইউএনও তাহমিলুর রহমান দাবি করেন, বরাদ্দের কোনো ঘাটতি নেই। অবশ্য উপদ্রুত এলাকায় ত্রাণ বঞ্চিত হওয়ার কথা উড়িয়ে না দিয়ে তিনি বলেন, হয়তো দু-একজন বাদ পড়তে পারেন। তাঁরা প্রতিনিয়ত খোঁজ নিচ্ছেন। কেউ বাদ পড়ে থাকলে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দুর্গতদের সবাই সহায়তা পাচ্ছেন।

বসতঘরে বন্যার পানি উঠে যাওয়ায় টানা চার দিন পানিবন্দি ছিলেন গোয়াইনঘাট উপজেলার সানকি ভাঙা গ্রামের দরিদ্র রাজু মিয়া। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ৮ জনের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম শ্রমজীবী রাজু মিয়ার আয় রোজগার ক'দিন বন্ধ ছিল। ফলে পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কোনোরকমে দিন কেটেছে তাঁর।

তিনি বলেন, সরকারি বা বেসরকারি কোনো ত্রাণ পাইনি। কোনো জনপ্রতিনিধিও আমাদের খোঁজ নেয়নি। আসামপাড়া হাওর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্ত রুমি বেগম তিন সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন। অন্যের বাড়িতে কাজকর্ম করে সংসার চালানো রুমি বেগমও কোনো ত্রাণ পাননি বলে জানান। একই গ্রামের দিনমজুরের স্ত্রী আয়শা বেগমও ত্রাণ পাননি।

বিয়ানীবাজার উপজেলায় নতুন করে মাথিউরা, তিলপাড়া, মোল্লাপুর ইউনিয়নের কিছু গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের বন্যাকবলিত মানুষের তালিকা প্রণয়নের কাজ এখনও চলছে।

মাথিউরা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আমান উদ্দিন বলেন, শনিবার রাত থেকে ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এখনও পানি বাড়ছে। মেম্বারদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন করছেন। এই কাজ শেষ হলে উপজেলায় জমা দেওয়া হবে। বিয়ানীবাজারে সরকারি হিসাবে ১৫ হাজার পরিবারের মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। তাদের জন্য ৩০ টন চাল ও ১০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবারের চাহিদা রয়েছে। তবে ২৬ টন চাল ও মাত্র ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ মিলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিয়ানীবাজারের শেওলা ইউনিয়নের ঘড়ূয়া গ্রামের দিনমজুর ছবুর আলী বলেন, 'কাজ নাই, খুব কষ্টে আছি। পাঁচ দিন ধরে খেয়ে-না খেয়ে আছি। কোনো সাহায্য পাই নাই। একই ইউনিয়নের শালেশ্বর গ্রামের ময়না মিয়া ও কোনা শালেশ্বর গ্রামের আমির আলী জানান, তাঁরা কোনো ত্রাণ পাননি। মাথিউরা ইউনিয়নের খলাগ্রামের মাহমুদ হোসেন বলেন, দুই দিন ধরে পানিবন্দি। চেয়ারম্যান-মেম্বার কেউ খবর নেননি।

গোয়াইনঘাটে বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন  কৃষক। নোয়াগাঁও গ্রাম থেকে ছবিটি তুলেছেন ইউসুফ আলী

কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) ফখর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ত্রাণের জন্য মানুষ হাহাকার করছে। সরকার যে ত্রাণ দিয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। তাই ওয়ার্ডের অনেক পানিবন্দি মানুষকে ত্রাণ দিতে পারেননি।

কানাইঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মুমিন চৌধুরী বলেন, সরকার থেকে ৫৫ টন চাল, দেড় হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ৫০০ প্যাকেট শিশুখাদ্য ও নগদ ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও বরাদ্দের আশ্বাস মিলেছে।

সুনামগঞ্জেও সংকট : সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ঢলের পানি নেমেছে বেশিরভাগ বাড়িঘর থেকে। তবে বাড়ির আশপাশে, যোগাযোগ সড়কসহ কারও কারও কর্মক্ষেত্রেও পানি থাকায় বেকায়দায় পড়েছে অনেক দরিদ্র পরিবার। ত্রাণের অপ্রতুলতায় কর্মহীন অনেকে এখনও সরকারের দেওয়া সহায়তাও পায়নি। ত্রাণ বিতরণে ওয়ার্ড পর্যায়ে কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খলার খবরও আছে। ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যরা অবশ্য বলছেন, 'ত্রাণের অপ্রতুলতায় লুকিয়ে মানুষকে সহায়তা দেওয়া লাগছে। এভাবে ত্রাণ বিতরণ করা কঠিন।'

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের হিসাব অনুযায়ী বন্যায় সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়ারাবাজার ও সুনামগঞ্জ সদরের ৭ হাজার ৪০০ পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৭ হাজার মানুষ। ওই উপজেলাগুলোয় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। আশ্রয় নিয়েছে ১ হাজার ৫০০ মানুষ। সোমবার পাঁচটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বন্যার্তরা বাড়ি ফিরেছেন।

বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই তিন উপজেলার মধ্যে ছাতকে ৩০ টন, দোয়ারাবাজারে ৩০ টন এবং সুনামগঞ্জ সদরে ২০ টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। এর মধ্যে জেলা ত্রাণ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ছাতক ও দোয়ারাবাজারে ২৫ টন করে এবং সুনামগঞ্জ সদরে ১৫ টন চাল পাঠানো হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ১৯ মে থেকে ত্রাণ বিতরণ শুরু হলেও এখনও অনেকে সহায়তা পায়নি। দোয়ারাবাজারের নৈনগাঁও আশ্রয়কেন্দ্রের ১৫ পরিবারের কেউ-ই ত্রাণ পাননি বলে দাবি করেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। এই আশ্রয়কেন্দ্রের জমির আলী, আরফান আলী, ইব্রাহিম মিয়া, ছম্বুর আলী, মোমিন উদ্দিন, জাহের আলী, নেয়ারুন্নেছা, আমির আলী (১), আমির আলী (২), জমির আলী (২) ও করম আলীর ঘরে হাঁটুসমান পানি ছিল।

দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আব্দুল গাফ্‌ফার বলেন, তাঁর ওয়ার্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ পরিবারের তালিকা দিয়েছেন। পাওয়া গেছে ৩০ জনের জন্য ১০ কেজি করে চাল, ২০ পেকেট শুকনো খাবার। এই সহায়তা তিনি কাকে দেবেন? এই অবস্থায় লুকিয়ে লুকিয়ে ত্রাণ দিতে হচ্ছে।

বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া পচা ধান কেটে মাড়াই দিচ্ছেন কৃষক। ছবিটি  সিলেটের সালুটিকর এলাকা থেকে তোলা

এই ইউনিয়নের পশ্চিম মাছিমপুরের পূর্বাংশের আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দা বন্যাদুর্গত সুকেশ দাশ, রতীশ দাশ ও ভূষণ দাশের পরিবারও কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি বলে দাবি করেছে।

দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ বলেন, তাঁর ইউনিয়নে অন্তত ২ হাজার মানুষকে এই মুহূর্তে খাদ্য সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। তাঁরা পেয়েছেন ৮ টন চাল, দিতে পেরেছেন ৮০০ মানুষকে। ৪০০-এর মতো শুকনো খাবারের প্যাকেট বিতরণ হয়েছে। নগদ কোনো টাকা পাননি।

জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সরকার দুর্গত মানুষের পাশে আছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে সাড়ে ১৪ কেজি ওজনের আরও ৫ হাজার বস্তার খাদ্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নগদ ১০ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে জেলা প্রশাসক শুক্র, শনি ও রোববার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ত্রাণ বিতরণ করেছেন।