ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

চতুর্থ শিল্পে স্মার্ট বিপ্লব

চতুর্থ শিল্পে স্মার্ট বিপ্লব

সাব্বিন হাসান

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৪ | ০০:০৯

রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার ও বিশ্ব বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জে দেশীয় শিল্প খাতে প্রযুক্তির সর্বোত্তম প্রয়োগ জরুরি। বহির্বিশ্বের পদক্ষেপ ও অর্জন প্রকৃত অর্থেই উদাহরণ। শিল্প খাতে প্রযুক্তির বহুমাত্রিক ব্যবহার এখন দৃশ্যমান।
বস্ত্র ও চামড়াজাত পণ্যশিল্প
বস্ত্রশিল্প থেকে বাংলাদেশের রপ্তানির সিংহভাগ আসে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক। আধুনিক বিশ্বে পোশাক ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ভার্চুয়াল প্রোটোটাইপিং, থ্রিডি ডিজাইন, কম্পিউটার এইডেড ম্যানুফ্যাকচারিং (সিএএম), ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংস (আইআইওটি) পদ্ধতি ব্যবহার করলেও দেশের বেশির ভাগ কারখানায় এসব প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি এখনও। স্মার্ট ফেব্রিক্স উইথ ইন্টিগ্রেটেড সেন্সর, অগমেন্টেড রিয়্যালিটি (এআর) ফিটিং রুম– পোশাক খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত করেছে। দ্রুত এসব পরিবর্তন করায়ত্ত না করলে পোশাকের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী সব দেশ এগিয়ে যাবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাত ও ওষুধশিল্প
অগ্রসরমান দেশি শিল্পগুলোর মধ্যে ওষুধশিল্প অন্যতম। সংশ্লিষ্ট খাতের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি উৎকর্ষতার মধ্যে মেশিন লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অন্যতম। ল্যাব ও ডেটা টেস্ট অ্যানালাইসিস ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে এআই ও মেশিন লার্নিং অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনবে। এআর-ভিআর প্রযুক্তিপণ্য গবেষকদের সক্ষমতা বাড়াবে। তথ্যপ্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবাকে দিচ্ছে নতুন রূপ। ই-হসপিটাল ধারণাকে দৃশ্যমান করছে। স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিন খাতের প্রযুক্তি সহায়ক সেবাগুলোর মধ্যে আছে রিমোট এইচডি ভিডিও সুবিধা, টেলিকনসালটেশন, রিমোট সার্জিক্যাল ডেমোনেস্ট্রেশন, মেডিকেল ভিডিও-অন-ডিমান্ড। অন্যদিকে মেডিকেল ইমেজ ও রোগীদের ডেটা নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদম পর্যালোচনার মাধ্যমে রোগের প্রাদুর্ভাব অনুমান করা, মেডিকেল চ্যাটবট ও ভার্চুয়াল হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো সহযোগী চিকিৎসাসেবা খাতে পরিবর্তন এখন দৃশ্যমান।
পরিবেশ, কৃষি ও প্রাণিবৈচিত্র্য
বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর। কম জমিতে সর্বোচ্চ ফলন এখন কৃষির বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল প্রযুক্তি কৃষিকাজে বিপ্লব ঘটাতে পারে। অন্যদিকে পরিবেশ ও প্রাণিবৈচিত্র্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে। কৃষিজমির নিখুঁত পর্যবেক্ষণ, শস্যের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন, আবহাওয়া পূর্বাভাসের মতো বিষয় ভালো ফলন নিশ্চিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার সুফল যোগ করবে।
পরিবেশ ও প্রাণিবৈচিত্র্য সংরক্ষণে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাণী সংখ্যার হিসাব নির্ধারণ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জরুরি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিকাজে অস্ট্রিয়াতে হুয়াওয়ে ও ড্রোন টেকের স্মার্ট ফার্মিং উদ্যোগটি অন্যতম। 
গ্যাস ও তেল
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে তেল ও গ্যাস ইন্ডাস্ট্রিতে নিখুঁতভাবে ফল্ট খুঁজে বের করা ও লেবেল দেওয়া, সার্ফেস পর্যবেক্ষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান, পূর্ববর্তী ডেটা বিশ্লেষণ ও ধারণা প্রদান সহজ হয়েছে। বাংলাদেশে জ্বালানিসেবার প্রসারে এমন অভিজ্ঞতা সময়োপযোগী।
ইলেকট্রনিকস পণ্যশিল্প
নিত্যকাজের কিছু ইলেকট্রনিকস পণ্যের উৎপাদন ও অ্যাসেম্বল এখন বাংলাদেশেই হচ্ছে। ওয়ালটন ছাড়াও বেশ কিছু ব্র্যান্ডের দেশি কারখানা আছে। তারা দেশের বাইরে ফ্রিজ, টিভি, এসি রপ্তানি করছে। ইন্ডাস্ট্রিতে সুপরিসরে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব। ম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়ায় পণ্যের ডিজাইন, পণ্যের উদ্ভাবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দৃশ্যমান। সাপ্লাই চেইন ও পেমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে জনপ্রিয় ব্লকচেইন। ন্যানোইলেকট্রনিক প্রযুক্তি ইলেকট্রনিকস পণ্যের মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
ম্যানুফ্যাকচারিং
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রক্রিয়াকরণকে গতিশীল করছে। পণ্যের মান যাচাই, ত্রুটিপূর্ণ পণ্য চিহ্নিত, লজিস্টিক প্ল্যানিং ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি সহায়ক। ইন্টেলিজেন্ট ডিভাইস ‘অ্যাটলাস ৫০০’র সঙ্গে হুয়াওয়ে মডেল আর্টস যুক্ত হয়ে মালয়েশিয়ার মরিচ ইন্ডাস্ট্রিতে সাড়া জাগিয়েছে, যা ভবিষ্যতের খাদ্যপণ্য শিল্পে পরিবর্তন আনবে। নষ্ট হয়ে যাওয়া মরিচ শনাক্তের ফলে উৎপাদনশীলতা বহু গুণে বাড়ানো সম্ভব।
স্মার্ট হোম-লাইফস্টাইল
মধ্যবিত্ত শ্রেণির অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ হচ্ছে বাংলাদেশে। জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, যা পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। এখন স্মার্ট লাইফস্টাইল ও স্মার্ট হোমপ্রযুক্তি সহজলভ্য। তাই বাড়ছে বিনিয়োগ। এআই চালিত সব অপারেটিং সিস্টেমে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তাপমাত্রা, ঘরের আলো, শব্দ, নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ দিতে সক্ষম। প্রতিদিনের জীবন এখন স্বাচ্ছন্দ্যময়। অ্যামাজন, অ্যাপল, গুগল, হুয়াওয়ে স্মার্টফোন হোমপ্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব দৃশ্যায়ন করেছে। উল্লিখিত নির্মাতারা টিভি, স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ, ওয়াইফাই ম্যাশ ছাড়াও সব ধরনের প্রযুক্তিসেবার সমন্বয়ে গ্রাহকদের স্মার্ট হোম ও স্মার্ট লাইফস্টাইলকে করেছে অবিচ্ছেদ্য।
নগরায়ণ ও পরিবহন
ঢাকার মতো জনবহুল শহরের স্মার্ট নগরায়ণ সময়ের দাবি। বিশ্বের অন্যান্য শহরের মতো ঢাকায়ও স্মার্ট সিটি ও স্মার্ট পরিবহন ব্যবস্থা অতীব জরুরি। স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা ও রিয়েল-টাইম ট্রাফিক ব্যবস্থার বিকল্প নেই। স্মার্ট সিটি গড়তে আইসিটি অবকাঠামো ও সেবার আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে হবে। উত্তর-পশ্চিম জার্মানির শহর গেলসেনক্রিচেনকে আধুনিক স্মার্ট শহরের ছোঁয়া দিতে ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে কাজ করেছে হুয়াওয়ে। যার মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিতের সঙ্গে ক্লাউড, নেটওয়ার্ক ও প্ল্যাটফর্ম প্রযুক্তি অন্যতম। শহরটিতে ১৩ হাজার কিলোমিটারের ফাইবার-অপটিক কেবল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়; যার মাধ্যমে সব ধরনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, হসপিটাল ও স্কুল সংযুক্ত। শহরটিতে এখন ৪০ হাজার ইন্টারনেট সার্ভিস গ্রাহক আর ৫০ হাজার ওয়াই-ফাই ব্যবহারকারী আছে। গণপরিবহন, সিটি সেন্টার, ফুটপাত ও চিড়িয়াখানা ছাড়াও পাবলিক প্লেসে সহজেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন শহরটির নাগরিকরা।
বিমান, সমুদ্র ও স্থলবন্দর
সব ধরনের বন্দর দেশটির অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বাংলাদেশেও সব ধরনের বন্দর সচল। অর্থনীতির চাকা ক্রিয়াশীল রাখতে দ্রুত বন্দর ব্যবস্থাপনা জরুরি। যেমন অটোমেটেড বর্ডার কন্ট্রোল (এবিসি) ব্যবস্থায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানিং, ফেসিয়াল রিকগনিশন ও বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি বর্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সমুদ্রবন্দরে কার্গো ট্র্যাকিং সিস্টেমে আরএফআইডি ট্যাগের ব্যবহার, ভ্যাসেল ট্রাফিক সার্ভিসেস (ভিটিএস) ব্যবস্থায় রাডার ছাড়াও প্রযুক্তিপণ্য পরিবহনে সহায়ক। সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তি অপরিহার্য। এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, এয়ারপোর্ট অপারেশন্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেম, ব্যাগি হ্যান্ডলিং সিস্টেম, বায়োমেট্রিক আইডেন্টিফিশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অভূতপূর্ব পরিবর্তন দৃশ্যায়ন করবে।
 

আরও পড়ুন

×