বিজ্ঞানের কল্পকাহিনি এবার বাস্তবে রূপায়িত করলেন নাসার গবেষকরা। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা নভোচারীদের মুখোমুখি হয়ে স্বাস্থ্যসেবার পরামর্শ দিয়েছেন এক ডাক্তার। মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করা ইএসএ নভোচারী থমাস পেসকেটের তোলা ছবিতে দেখা যায়, কয়েকজন নভোচারীর মাঝখানে দিব্যি বসে আছেন নাসার ফ্লাইট সার্জন ডাক্তার জোসেফ স্মিড! তিনি মহাকাশচারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এজন্য তাকে উড়ে সশরীরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) যেতে হয়নি। সর্বাধুনিক 'হলোপোর্টেশন' প্রযুক্তি স্মিডকে অশরীরী অবস্থায় আইএসএসে নিয়ে গিয়েছিল। স্মিডের সঙ্গে ট্রান্সডাইমেনশনাল যাত্রায় যোগ দিয়েছিলেন 'এইক্সিয়া অ্যারোস্পেস'-এর প্রধান নির্বাহী ফার্নান্দো দে লা পেনা এবং স্মিডের আরও কয়েকজন সহকর্মী। তারাই প্রথম মানুষ যাদের পৃথিবী থেকে মহাকাশে 'হলোপোর্ট' করা হয়েছে।

হলোপোর্টেশন কী
'হলোপোর্টেশন' শব্দটি প্রযুক্তি দুনিয়ায় একটি নতুন সংযোজন। মূলত 'হলোগ্রাম' আর 'টেলিপোর্টেশন' শব্দ দুটিকে একত্রে ডাকা হচ্ছে 'হলোপোর্টেশন' নামে। হলোগ্রাম এসেছে হলোগ্রাফি থেকে। হলোগ্রাফি হচ্ছে এমন এক ধরনের ফটোগ্রাফিক প্রযুক্তি, যা কোনো বস্তুর ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এ প্রযুক্তিতে তৈরি করা ত্রিমাত্রিক ছবি 'হলোগ্রাম' নামে পরিচিত। মূলত এই ধরনের ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরি করার জন্য লেজার, ইন্টারফারেন্স ডিফ্রাকশন, লাইট ইনটেনসিটি রেকর্ডিং এবং ইলিউমিনেশন অব দ্য রেকর্ডিং- এই চারটি প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়। হলোগ্রাফি এবং ফটোগ্রাফির মধ্যে মূল পার্থক্য হলো ফটোগ্রাফি দ্বিমাত্রিক এবং হলোগ্রাফি ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির।

কোনো মানুষ বা কোনো বস্তুকে তাৎক্ষণিকভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তিই হলো টেলিপোর্টেশন। এটি টেলিট্রান্সপোর্টেশন নামেও পরিচিত। বাস্তবে একে অসম্ভব মনে হলেও বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হিসেবে অনেক আগে থেকেই শক্ত অবস্থানে রয়েছে টেলিপোর্টেশন।

এই দুই প্রযুক্তির সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে হলোপোর্টেশন। ডাক্তার জোসেফ স্মিডের মতে, মহাকাশ ভ্রমণের একটি একেবারেই নতুন উপায় এটি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের দেহ পৃথিবীতে থেকেই তার ভার্চুয়াল অস্তিত্ব মহাকাশে ভ্রমণ করতে পারবে। স্মিড মনে করেন, আমাদের দেহ সেখানে থাকবে না, তবে মানব অস্তিত্ব অবশ্যই থাকবে। প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট সিনেট জানায়, বেশ ক'বছর আগেই এই প্রযুক্তি ভেবে রেখেছিল সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট। তবে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞাপনী খাতে নতুন বিপল্গব আনা। সেই ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে নাসা, একেবারে স্পেস স্টেশন পর্যন্ত!

মহাকাশে হলোপোর্টেশনের জাদু
প্রথমবারের মতো 'ভার্চুয়াল ট্রান্সপোর্টশন'-এর মাধ্যমে পৃথিবীর গণ্ডি ছাড়িয়ে মহাকাশে গেছে কোনো মানুষের অস্তিত্ব। সিনেট জানিয়েছে, গত বছরের অক্টোবর মাসে ডাক্তার স্মিডকে মহাকাশে নিতে প্রথমে উন্নত মানের থ্রিডি মডেল তৈরি করা হয়েছিল। তারপর সেই মডেলের ডাটা সংকুচিত (কমপ্রেস) করে পাঠানো হয়েছে আইএসএসে। সেই সংকুচিত ডাটা থেকে আবার থ্রিডি মডেল তৈরি হয়েছে আইএসএসের ল্যাবে এবং এর সবই ঘটেছে 'রিয়াল টাইম'-এ বা তাৎক্ষণিকভাবে।

এই যাত্রায় নভোচারীরা মাইক্রোসফটের তৈরি মিক্সড রিয়ালিটি হেডসেট, 'হলোলেন্স' ব্যবহার করেছেন। হলোলেন্সের মাধ্যমেই নভোচারী ও ডাক্তার স্মিড একে অন্যকে সামনাসামনি দেখতে পেয়েছেন, একে অন্যের সঙ্গে বাক্যবিনিময়ও করতে পেরেছেন। মাঝে হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব থাকলেও 'ইউরোপিয়ার স্পেস এজেন্সি (ইএসএ)'-এর নভোচারী টমাস পেসকেট বেশ স্বচ্ছন্দেই দ্বিমুখী সম্মুখ আলোচনা চালিয়ে গেছেন স্মিড এবং ফার্নান্দো দে লা পেনার সঙ্গে। এমনকি হলোগ্রাফের মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন তিনজনই। এই পরীক্ষার সময় পেসকেট একমাত্র অংশগ্রহণকারী যিনি একটি অগমেন্টেড রিয়েলিটি হেডসেট পরেছিলেন, যা তাকে অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের ডিজিটাল থ্রিডি হলোগ্রাম হিসেবে উপলব্ধি করতে সক্ষম করেছিল। যদিও স্মিড এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা এ ধরনের ডিভাইসগুলো পরেননি।

নাসা এই প্রযুক্তি প্রসঙ্গে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এই প্রযুক্তি ব্যক্তিগত মেডিকেল কনফারেন্স, সাইকিয়াট্রিক কনফারেন্স, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং ভিআইপিদের মহাকাশ স্টেশনে নিয়ে নভোচারীদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে ব্যবহার করবে।এই প্রযুক্তি সফল হলে, নভোচারীদের টেলিমেডিসিন সেবা দেওয়া সম্ভব হবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। এ ছাড়াও ভবিষ্যতে দূর মহাকাশ ভ্রমণেও বড় ভূমিকা রাখবে এ প্রযুক্তি। প্রচলিত রেডিও ওয়েভনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থায় সময়ক্ষেপণ হয় অন্তত ২০ মিনিট। কিন্তু হলোপোর্টেশনের মাধ্যমে পুরো সময়টাই মহাকাশযানে অশরীরী উপস্থিতি থাকবে হলোপোর্টারদের। নাসা এই প্রযুক্তির সঙ্গে আরও 'অগমেন্টেড রিয়ালিটি' ফিচার সমন্বয়ের পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে আইএসএসে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পাবেন হলোপোর্টাররা। কেবল নিজ হাতের স্পর্শের অনুভূতি বাদে ভ্রমণের সব অনুভূতিই পাবেন হলোপোর্টেশন প্রযুক্তির ব্যবহারকারীরা।

বিষয় : হলোপোর্টেশন জোসেফ স্মিড টেলিপোর্টেশন

মন্তব্য করুন