প্রযুক্তি

১২ হাজার 'গুগল স্কলারস সাইটেশনের' মাইলফলক ড. মামুনের

সাফল্য

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

কামরান সিদ্দিকী

সাইটেশন হচ্ছে যে কোনো তথ্যের তথ্যসূত্র। কোনো গবেষকের একটি গবেষণাকর্ম অন্য যত সংখ্যক গবেষণাকর্মে উদ্ৃব্দত হয়েছে, তাকে ওই গবেষণাকর্মের 'সাইটেশন' সংখ্যা বলে। একজন গবেষকের সব গবেষণাকর্মের 'সাইটেশন' সংখ্যার যোগফলকে ওই গবেষকের 'সাইটেশন ইনডেক্স' বলে। বাংলাদেশে কর্মরত প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে গুগল স্কলারসে ১২ হাজার 'স্কলারস সাইটেশনের' মাইলফলক অতিক্রম করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. এ. এ. মামুন (আবদুল্লাহ আল মামুন)। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা এই গবেষক 'প্লাজমা ফিজিক্সে' অসামান্য অবদানের জন্য এরই মধ্যে জার্মান চ্যান্সেলর পুরস্কার, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে একাধিকবার 'বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স' গোল্ড মেডেলসহ দেশ-বিদেশে খ্যাতনামা নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ডাস্টি প্লাজমা ফিজিক্সের ওপর তার এবং পিএস শুক্লার যৌথভাবে লিখিত 'ইনট্রোডাকশন টু ডাস্টি প্লাজমা' বইটি 'ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স, লন্ডন' কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।

২০১৫ সালের মে মাসে গুগলের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের গবেষণার সাইটেশন গুগল স্কলারে Google Scholar Citations  Public Profile) এই বাংলাদেশি বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গুগল স্কলারসের সর্বশেষ (৯ ফেব্রুয়ারি '১৯) তথ্যমতে, অধ্যাপক মামুনের সাইটেশন সংখ্যা ১২ হাজার ১২টি। গবেষণা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পদার্থবিজ্ঞান তো বটেই, অন্যান্য ডিসিপ্লিনেও বাংলাদেশে কর্মরত বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কেউ ১২ হাজার সাইটেশন লাভ করেছেন বলে তাদের জানা নেই। বিজ্ঞান গবেষণায় অধ্যাপক মামুনের এই অর্জন মাতৃভূমি বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং গবেষকদের গবেষণায় লেগে থাকতে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে তারা মনে করেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম বলেন, '১২ হাজার সাইটেশন হওয়া একজন গবেষকের জন্য অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এটা তার গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে।'

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সালেহ্‌ হাসান নকীব বলেন, 'রিসার্চ গেট, গুগল স্কলারসসহ বিভিন্ন গবেষণা পর্যবেক্ষণকারী তথ্যসূত্র অনুসারে অধ্যাপক এ এ মামুনই বাংলাদেশে কর্মরত বিজ্ঞানীদের মধ্যে সর্বাধিক সাইটেশনের অধিকারী। পদার্থবিজ্ঞান তো বটেই, অন্য কোনো ডিসিপ্লিনেও এত সংখ্যক সাইটেশনের অধিকারী কোনো বিজ্ঞানী আছেন বলে আমাদের জানা নেই।'

বাংলাদেশের গবেষণা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী ম্যাগাজিন 'সায়েন্টিফিক বাংলাদেশে'র প্রতিষ্ঠাতা ড. মুনির উদ্দিন আহমেদ বলেন, 'গুগুল স্কলারসে দশ হাজার সাইটেশন একটি উল্লেখযোগ্য এবং উদযাপনযোগ্য মাইলফলক, বিশেষ করে একজন বাংলাদেশি গবেষকের জন্য। দশ হাজার সাইটেশনের মাইলফলক অতিক্রম করে ১২ হাজারের ঘরে পৌঁছে বাংলাদেশি গবেষকদের সামনে তিনি এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। এই সাইটেশন সংখ্যা তার গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রভাবকেই তুলে ধরে। বিগত বিশ বছরে এই অর্জন গবেষকদের গবেষণায় লেগে থাকতে এবং বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনে অনুপ্রেরণা জোগাবে।'

জানা গেছে, এ এ মামুন আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা পদার্থবিজ্ঞনের একজন শিক্ষক ও গবেষক। ২০০৯ সালে তার সকল অতীত গবেষণা ও শিক্ষকতার স্বীকৃতিস্বরূপ জার্মানির এভিএইচ বেসেল রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড (নগদ ৪৫ হাজার ইউরো এবং আজীবন জার্মানিতে অ্যাডভান্স রিসার্চের সুযোগ) পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন। পদার্থবিজ্ঞানে তার বিশাল অবদানের জন্য ২০০৬ সালে ইতালির ত্রিয়েস্টে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স (টিডব্লিউএএস) ইয়াং সায়েন্টিস্ট প্রাইজ, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স গোল্ড মেডেল ২০১১ (সিনিয়র গ্রুপ) ও ২০০৪ (জুনিয়র গ্রুপ), বেস্ট ইয়াং ফিজিস্টি অ্যাওয়ার্ড ২০০০ (ত্রিয়েস্তে, ইতালি) লাভ করেন। তিনি এ পর্যন্ত ৪০০টিরও বেশি প্রবন্ধ বিভিন্ন বিদেশি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করেন। বিশ্বের অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতার প্রস্তাব এলেও তিনি সেগুলো ফিরিয়ে দিয়ে দেশেই ফিরে আসেন। একনিষ্ঠভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন তার অধ্যাপনা ও গবেষণাকর্ম।

তরুণ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের উদ্দেশে অধ্যাপক এ এ মামুন বলেন, 'আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের গবেষণা করতে বা করাতে হলে নিজ নিজ ক্ষেত্রের জার্নালগুলোর মান এবং পৃথিবীর অন্যান্য গবেষকদের তুলনায় নিজের গবেষণাকর্মের মান জানাটা অতি জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বমানের গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।'