মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস ২০২০ বাতিল

প্রযুক্তিপণ্যের বাজার বিপর্যয়ের মুখে

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাশেদ মেহেদী

করোনাভাইরাস আতঙ্কে বাতিল হয়ে গেছে প্রযুক্তি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আয়োজন মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস (এমডব্লিউসি)। প্রতি বছর এ আয়োজনেই নতুন প্রযুক্তিপণ্যের সঙ্গে পরিচয় করে দেওয়া হতো দুনিয়াকে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এমডব্লিউসির আয়োজক জিএসএমএ কর্তৃপক্ষ জানায়, করোনাভাইরাসের বিস্তারজনিত চরম উদ্বেগজনক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৪ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিতব্য এমডব্লিউসির আয়োজন বাতিল করা হয়েছে। এখন প্রস্তুতি হবে আগামী বছর আরেকটি সফল আয়োজনের জন্য। এমডব্লিউসি স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
এ দিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিপজ্জনক আকার ধারণ করায় বড় ধরনের সংকটে পড়তে যাচ্ছে প্রযুক্তিপণ্যের বাজারও। প্রায় ৬০ শতাংশ প্রযুক্তিপণ্যের বাজার চীনের দখলে থাকায় বাংলাদেশের বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিশ্ববাজারেও এর বড় প্রভাব পড়ছে ব্যাপকভাবে।
বাংলাদেশে প্রযুক্তিপণ্য আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে চীন থেকে উড়োজাহাজে প্রযুক্তিপণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। শুধু সমুদ্রপথে জাহাজে কিছু পণ্য গত সপ্তাহ পর্যন্ত এসেছে। এটিও যে কোনো মুহূর্তে বন্ধ হলে বাজারে সব ধরনের প্রযুক্তিপণ্যের দাম বাড়তে পারে। তবে বাংলাদেশেই সংযোজন হওয়ার ফলে আগামী দুই-তিন মাস মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেটের বাজারে প্রভাব পড়বে না বলে জানা গেছে। কিন্তু সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের হ্যান্ডসেট সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামাল সংকটে পড়বে। কারণ, প্রায় শতভাগ কাঁচামালই আসে চীন থেকে।
মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাভাইরাস সংকট পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ হলে চীন থেকে যন্ত্রপাতি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং চলমান কারিগরি উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সরঞ্জামাদির প্রায় ৭০ শতাংশই চীনের দুটি কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে। এরই মধ্যে যন্ত্রপাতি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে গেছে। ফলে মোবাইল নেটওয়ার্কেও সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চীনে করোনাভাইরাস আতঙ্কে অধিকাংশ বড় কোম্পানির কারখানায় উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে। আরও দুই মাস উৎপাদন বন্ধ থাকলে বিশ্ব প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে বড় বিপর্যয় দেখা দেবে। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে প্রযুক্তি দুনিয়ায় বছরের সবচেয়ে বড় আয়োজন 'মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসেও' এ বছর অংশ নিচ্ছেন না অনেক কোম্পানি ও বিশেষজ্ঞ।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, শুধু প্রযুক্তিপণ্য নয়, করোনা সংকট দীর্ঘায়িত হলে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরই মধ্যে টেলিটকের একটি প্রকল্পের জন্য ডিভাইস আনা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, চীন থেকে পণ্য আনার জন্য কার্গো বিমান পাওয়া যাচ্ছে না।
পণ্য আসা কমেছে চীন থেকে :বাংলাদেশের বাজারে নিত্য ব্যবহার্য ছোট ছোট পণ্য থেকে বিশাল মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনা, উচ্চগতির ইন্টারনেটের জন্য ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের সব ধরনের যন্ত্রপাতির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ চীন। বর্তমানে নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতির প্রায় ৭০ শতাংশই সরবরাহ করে চীনের হুয়াওয়ে ও জেডটিই। কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে হেডফোন, চার্জার, স্পিকার, মেমোরিকার্ড, প্রিন্টার, রাউটারসহ নিত্য ব্যবহার্য এবং শৌখিন প্রযুক্তিপণ্যের প্রায় শতভাগই আসে চীন থেকে। গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে এসব পণ্য আসা কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে প্রায় আসছে না বললেই চলে।
রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহাব উদ্দিন সমকালকে জানান, এখন পর্যন্ত সবকিছু চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে। যদি সংকট দীর্ঘায়িত হয় এবং চীন থেকে যন্ত্রপাতি না নিয়ে আসা যায়, তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে। কারণ, বেশিরভাগ যন্ত্রপাতিই আসে চীন থেকে। যন্ত্রপাতি না এলে চলমান কারিগরি উন্নয়ন ব্যাহত হবে, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে। এটা শুধু টেলিটকের ক্ষেত্রে নয়, কমবেশি সব অপারেটরের ক্ষেত্রেই ঘটবে। কারণ, প্রযুক্তিপণ্য এবং যন্ত্রপাতি উৎপাদন করা বিশ্বের সব বড় কোম্পানির কারখানাই চীনে অবস্থিত। সংকট খুব বেশি দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি অচলাবস্থার দিকে চলে যাবে। যন্ত্রপাতি না পাওয়া গেলে নতুন প্রকল্পগুলো বিলম্বিত হলে পুরো টেলিযোগাযোগ সেবাই থমকে যাবে।
নিত্য ব্যবহার্য প্রযুক্তিপণ্যের অন্যতম বড় আমদানিকারক মোশন ভিউর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরুল হাসান সমকালকে জানান, দেশে প্রযুক্তিপণ্য নিয়ে আসা হয় দুই ভাবে। সমুদ্রপথে জাহাজে এবং আকাশপথে উড়োজাহাজে। হালকা ধরনের পণ্য উড়োজাহাজে এবং ভারী ধরনের পণ্য জাহাজে নিয়ে আসা হয়। গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে উড়োজাহাজের মাধ্যমে চীন থেকে পণ্য আসা বন্ধ রয়েছে। ফলে এরই মধ্যে হালকা পণ্য যেমন স্পিকার, হেডফোন, রাউটার, চার্জার, মেমোরি কার্ড প্রভৃতির দাম কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। সমুদ্রপথে জাহাজে পণ্য আসার পরিমাণও কমছে। এ ছাড়া আগের যে মজুদ রয়েছে, তাও এক মাসের বেশি থাকবে না। ফলে করোনা সংকট পরিস্থিতি আর এক মাস বিস্তৃত হলে দেশে হালকা প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে বড় ধরনে প্রভাব পড়বে। বাজারে পণ্যের সংকট হবে এবং অনিবার্যভাবে দাম বাড়বে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ মোবাইল হ্যান্ডসেট সংযোজন কারখানা স্থাপন করা ট্রানশান বাংলাদেশের (টেকনো ব্র্যান্ড) ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজওয়ানুল হক সমকালকে জানান, দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট সংযোজন হলেও এর কাঁচামাল আসে চীন থেকে। বর্তমানে কাঁচামালের যে মজুদ আছে তা দিয়ে আরও প্রায় দুই মাস চলবে। এর মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দেশের ছোট-বড় সব হ্যান্ডসেট সংযোজন কারখানাই কাঁচামাল সংকটে পড়বে।
নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা চীনের একটি কোম্পানির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, করোনাভাইরাস যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সেই সতর্কতার কারণেই চীনে অনেক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া বেশিরভাগ কারখানায় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকের উপস্থিতিও কমে গেছে। ফলে অতি জরুরি ছাড়া পণ্যের 'শিপমেন্ট' বন্ধ। কারণ, পণ্যের বাজারের চেয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় করণীয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিপর্যয়ের খবর :নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ইকোনমিস্টসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গত কয়েকদিনে একাধিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এরই মধ্যে চীনে অ্যাপল-এর আইফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান ফক্সন ও পেত্রাগন গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে খুব শিগগির আইফোন সরবরাহে বড় সংকট দেখা দেবে। কারণ, ফক্সনের সংযোজন কারখানাটি করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল উহানের খুব কাছে অবস্থিত।
প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, জেডটিইসহ চীনের কয়েকটি বড় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে প্রথম দিকে উচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চললেও জানুয়ারি মাসের ১৫ তারিখের পর থেকে উৎপাদন পঞ্চাশ শতাংশেরও কমে চলে এসেছে। এর বড় কারণ হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শ্রমিক অনেকেই ভয়ে অফিসে আসছেন না। এ ছাড়া সরকারিভাবেও জোরালো সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কারণে চীনে অনেক প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কর্মঘণ্টাও কমিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে অনেক কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পণ্য সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে এরই মধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী এক মাসের মধ্যেই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ দুনিয়াজুড়ে প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।


বিষয় : মোবাইল