চীনের একদল গবেষক 'জিউজাং' নামে বিশেষ প্রযুক্তির কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করেছেন। চীনা গবেষকদের দাবি, তাদের তৈরি নতুন প্রজন্মের এ কম্পিউটার ২০০ সেকেন্ডে এমন সংখ্যক হিসাব করতে সক্ষম হবে, প্রচলিত সুপার কম্পিউটার একই হিসাব করতে ২৫০ কোটি বছর সময় নেবে!

কীভাবে অবিশ্বাস্য এ হিসাব করবে চীনা গবেষকদের নতুন ঘরানার এ কম্পিউটার। এ সম্পর্কে বিস্তারিত উপস্থাপন করেছন তারা। প্রচলিত কম্পিউটার যেখানে বিটস হিসাব পদ্ধতি ব্যবহার করে সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিউবিটস পদ্ধতি ব্যবহার করবে।

কিউবিটস সম্পর্কে জানার আগে বিটস পদ্ধতি জেনে নেওয়া যাক। এ পদ্ধতিতে কম্পিউটার শূন্য অথবা ১ এমন বাইনারি বিটসে হিসাব করে। এই বিটস পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রচলিত কম্পিউটারগুলো চিপ খুবই সাধারণ কম্পোনেন্টে তৈরি। একেকটি ইলেকট্রনিক চিপ কতগুলো মডিউলের সমন্বয়ে তৈরি হয়। এ মডিউলগুলো আবার বিভিন্ন ধরনের লজিক গেট দ্বারা গঠিত, যার মূলে রয়েছে ট্রান্সজিস্টর। যত বেশি ট্রানজিস্টরের সমন্বয়ে একটি চিপ তৈরি হবে, তা তত বেশি জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারবে। কোনো একটি চিপে ব্যবহৃত ট্রানজিস্টরগুলোকে কোনো বড় শহরের দালানগুলোর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। দুটি দালানের মধ্যে দূরত্ব যত কম হবে, তত সহজে মানুষ কম সময়ে এক দালান থেকে অন্য দালানে যাতায়াত করতে পারবে। বাস্তব জগতে ইলেকট্রনিক চিপের মধ্যে যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। এ অবস্থাকে বলে কোয়ান্টাম টানেলিং। কোয়ান্টাম টানেলিং থেকেই কোয়ান্টাম চিপের ধারণা আসে। যেহেতু কোয়ান্টাম জগৎ আমাদের চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ থেকে একেবারে আলাদা, তাই সেখানে আমার চিরায়ত চিপগুলো অর্থহীন হয়ে পড়বে।

কোয়ান্টাম জগতে বিটসের পরিবর্তে কিউবিটস শব্দটি বেশি ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে কিউবিটসও ০ এবং ১ এই দুটি মানের সাহায্যে তথ্য সংরক্ষণ করলেও শুধু ইলেকট্রনের প্রবাহের ভিত্তিতে এর মান নির্ধারণ বা পরিবর্তন হয় না। ইলেকট্রনের স্পিন বা ফোটনের সাহায্যে কিউবিটসের মান নির্ধারিত হয়। বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ধারণার প্রবর্তন করেছেন, যা ০ এবং ১-এ দুটি বিটের সহাবস্থানের মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক সম্ভাব্যতাকে কাজে লাগিয়ে বহু তথ্য সংরক্ষণে একে সক্ষম করে তোলে। যা কম্পিটারের শক্তিকে দ্বিগুণ নয়, বহুগুণ করবে। এ শক্তি জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। যেমন- দুই কিউবিটে যদি চারটি সংখ্যা সংরক্ষণ করা যায়, তবে তিন কিউবিটে যাবে আটটি এবং চার কিউবিট পারবে ১৬টি সংখ্যা সংরক্ষণ করতে। এ ছাড়া কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে একই সঙ্গে একাধিক হিসাবকার্য সম্পন্ন করা যায়।

গত বছর গুগল ৫৩ কিউবিটের সিকোমর নামে এক বিশেষ ধরনের প্রসেসর তৈরি করে। গুগলের দাবি অনুযায়ী এটি কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের প্রথম ধাপ, যার মাধ্যমে মাত্র সাড়ে তিন মিনিটে এমন জটিল গাণিতিক হিসাব সম্পন্ন করা যায়। যা প্রচলিত সুপার কম্পিউটারগুলোর ক্ষেত্রে ১০ হাজার বছর সময় লাগত!

এবার আসা যাক চীনা গবেষকদের কথায়। তারা বোসন স্যাম্পলিংয়ের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে তারা ৫০টি ফোটন, ১০০টি ইনপুট, ১০০টি আউটপুট, ৩০০টি বিম স্প্লিটার এবং ৭৫টি বিশেষ মিরর ব্যবহার করে।

চীনা গবেষকদের দাবি, এ বিশেষ প্রযুক্তির কম্পিউটার ব্যবহার করে তারা দুই মিনিট ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নির্ণয় করতে সক্ষম হন। এমনকি সানওয়ে তাহিউলাইট যেটি বর্তমান বিশ্বের চতুর্থ শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার হিসেবে পরিচিত, সেটি ব্যবহার করে এ ফল নির্ণয় করতে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন বছর সময় লেগে যেত বলে দাবি করেছেন! অর্থাৎ আমাদের এ সৌরজগতের বর্তমান বয়সের অর্ধেকই অতিবাহিত হয়ে পড়বে এ ফল বের করতে গিয়ে। আশা করা যাচ্ছে, নতুন এ গবেষণা কম্পিউটিং ভুবনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটবে।

মন্তব্য করুন