গণমাধ্যমের কনটেন্ট (আধেয়) থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো যে আয় করছে, তা সংবাদ প্রকাশকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করাকে বাধ্যতামূলক করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশ সরকারকেও একই পথে হাঁটতে হবে। এতে আর্থিক সংকটে থাকা দেশের গণমাধ্যম শিল্প উপকৃত হবে।
সংবাদমাধ্যমের ডিজিটাল কনটেন্ট থেকে আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিতে বুধবার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে আইন পাস করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। নতুন এ আইনে ইন্টারনেট মাধ্যমে কোনো সংবাদ কনটেন্ট শেয়ার হলে সেখান থেকে আয়ের ন্যায্য অংশ সংশ্নিষ্ট প্রকাশককে দিতে হবে। এ আইনে নাখোশ ফেসবুকসহ সামাজিক গণমাধ্যমগুলো। আয়ের অংশ ভাগাভাগি না করতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুকে সংবাদ কনটেন্ট দেখা ও শেয়ারের সুবিধা বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি।
এর ফলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবহারকারীরা কোনো সংবাদ লিঙ্ক ফেসবুকে দেখা কিংবা শেয়ার করতে পারছেন না। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন, 'ফেসবুকের এ পদক্ষেপ ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও হতাশাজনক। অস্ট্রেলিয়া মাথানত করবে না।' এ ঘটনাকে ডিজিটাল কনটেন্টের বিলিয়ন ডলারের বাজারে নতুন মোড় হিসেবে দেখছেন প্রযুক্তি বিশ্নেষকরা। মূলত গুগল, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আয়ের সিংহভাগই আসে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাণিজ্য থেকে। আর এ আয়ের উৎস মূলত ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল কনটেন্ট, যার অন্যতম সংবাদ। কিন্তু বরাবরই গুগল কিংবা ফেসবুক এসব কনটেন্ট প্রকাশকদের সঙ্গে খুব সামান্যই আয় ভাগাভাগি করে থাকে।
একে অন্যায্য এবং গণমাধ্যমের বিকাশের জন্য হুমকি আখ্যায়িত করে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডিজিটাল কনটেন্টের আয়ের সুষম বণ্টনে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় অস্ট্রেলিয়া সরকার। নতুন এ আইন মেনে গুগল ও ইউটিউবসহ তাদের সব প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট প্রকাশের জন্য মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডকের নিউজ করপোরেশনকে অর্থ দিতে রাজি হয়েছে। তবে ফেসবুক কোনো রকম অর্থ ভাগাভাগিতে অস্বীকৃতি জানায়।
গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, গত বছর ফেসবুকে খবরের লিংক শেয়ারের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার প্রকাশকরা প্রায় ৪০ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করেছেন। কিন্তু প্রকাশকদের তুলনায় ফেসবুকের
আয় ছিল অনেক অনেক বেশি। অস্ট্রেলিয়ায় ১০০ ডলারে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন দেওয়া হলে তার ৮১ ডলারই পায় ফেসবুক ও ইউটিউব। দেশটির বেশিরভাগই মানুষই ফেসবুকের মাধ্যমে খবর পড়ে থাকেন।
মূলত বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপন বাণিজ্য একচেটিয়া দখলে রেখেছে ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউব। এতে মূলধারার গণমাধ্যমে সরাসরি বিজ্ঞাপন কমছে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে করোনার প্রাদুর্ভাবে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপন আরও কমে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে গণমাধ্যমের সংকট আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য মতে, দেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাণিজ্যের বাজার প্রায় দুই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর প্রায় পুরোটাই দখলে রেখেছে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবের মতো বহুজাতিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সরকারের উদার নীতিমালা এবং জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে দেশ থেকে শত শত কোটি টাকা নিচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।
ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির সমকালকে বলেন, ইন্টারনেট ভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনফারেন্সে বিগত কয়েক বছর ধরে আয় ভাগাভাগির বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু কাঠামোগতভাবে সেটি কীভাবে হবে- এ বিষয়ে চূড়ান্ত গাইডলাইন তৈরি সম্ভব হয়নি। এখানে ইন্টারনেট কোম্পানি, অবকাঠামো সেবাদাতা এবং প্রকাশকদের আয়ের বিষয়টি জড়িত। কিন্তু দুঃখজনক হলো, প্রায় পুরো আয় চলে যাচ্ছে ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে। এখানে ন্যায়সংগত বণ্টন জরুরি।
তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া সরকার এ কাজটিই শুরু করতে চেয়েছে। কিন্তু ফেসবুক উল্টো সংবাদ প্রচারের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। আয়ের ভাগাভাগিতে ফ্রান্সও নতুন নীতিমালা তৈরি করতে যাচ্ছে। তবে বৈশ্বিকভাবে এসব প্রতিষ্ঠানকে চাপে ফেলা গেলে আমাদের দেশের গণমাধ্যমও উপকৃত হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও প্রিয় ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা জাকারিয়া স্বপন বলেন, 'অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগটিকে সাধুবাদ জানাতে হবে। এটাকে নতুন শুরু হিসেবে দেখতে চাই। আমাদেরও ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। তারা শুধু ভ্যাট-ট্যাক্স দেবে এতটুকুতে থেমে গেলে হবে না। আয়ের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতে কথা বলতে হবে, চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যথায় দেশের গণমাধ্যমের অবস্থা ভবিষ্যতে আরও খারাপ হবে।'
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে জানান, গণমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে আয়ের সুষম বণ্টন জরুরি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো আমরাও কোনোভাবেই ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবকে বাগে আনতে পারছি না। তবে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা খুব প্রয়োজন।