শামীম রেজার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ ২০০৭ সালের শেষ দিকে। সে একদিন আমার কলকাতার তৎকালীন ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির। 'আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এলাম।' ভালো কথা। বাংলাদেশ থেকে আগত তরুণ কবি, উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত। ধারালো মুখশ্রী, তেরিয়া মেজাজ। ভালো লাগল আমার। আমি এমনিতে একটু একটেরে মানুষ, আমার কাছে তরুণ কবিদের আনাগোনা খুব কম। তাহলে হঠাৎ এই তরুণ এসে উদয় হলো কেন? দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ উদ্যমী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আত্মবিশ্বাসী এবং ব্যাপক বন্ধুত্বে বলীয়ান ছেলে, সে কেন আমার মতো মানুষের কাছে? আমি ভাবি। (বহু পরে বুঝতে পারি যে সে ছিল আমার কাছে এক খোদার ফরিশ্‌তা, সে এসেছিল আমাকে আমার প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের হৃদয়ের কাছে নিয়ে যাবে বলে!)
সত্যিই তা-ই ঘটল! প্রথম আলাপের মাসখানেকের মধ্যেই সে আমাকে ২০০৮ সালের বাংলাদেশ কবিতা উৎসবের আমন্ত্রণ জানিয়ে ঢাকায় নিয়ে গেল। সঙ্গে আমার স্ত্রী শর্মিলা।
১৯৮৭ সালে প্রথম বাংলাদেশে গিয়েছিলাম আমি কবিবন্ধু মৃদুল দাশগুপ্তের সঙ্গে; সেবারে আতিথ্য দিয়েছিলেন কবিবন্ধু ফরিদ কবির, তুষার দাশ ও সাজ্জাদ শরিফ। তার ঠিক ২১ বছর পর, আবার বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলাম আমি, মন ভরে উঠল পুলকে! উঠলাম শামীম রেজার ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে। শামীম তখন ব্যাচেলর, এক তোফা বাউণ্ডুলে বোহেমিয়ান কবি এবং তার ফ্ল্যাটটি ঢাকার একঝাঁক তরুণ কবির অবারিত হাটমন্দির। এমনিতে কোথাও বেড়াতে গিয়ে কারোর বাসায় থাকা আমার স্বভাববিরুদ্ধ, অচেনা শহরে হোটেলের নির্জন কক্ষ আমার প্রিয়তম ঠাঁই, কিন্তু এ যাত্রা শামীমের সনির্বন্ধ অনুরোধ এড়াতে পারলাম না। তার সেই ফ্ল্যাটে চারটে দিন রইলাম আমি ও শর্মিলা। এবং শামীম ও তার বন্ধুদের নিবিড় আতিথ্যে ও ভালোবাসায় আপ্লুত হলাম আমরা দু'জনে। সেখানে শামীম এবং আরও কয়েকজন তরুণ কবির (মাহমুদ শাওন, সফেদ ফরাজী, জুয়েল মোস্তাফিজ প্রমুখ) সঙ্গে দিনরাত আড্ডা দিয়েছি আমি, যা আমার জীবনের এক বিরল ঘটনা। অবিরাম এই তরুণ কবি-লেখকদের উন্মুখ সান্নিধ্যেই বাংলাদেশের হৃদয় যেন শত পুষ্পের মতো বিকশিত হলো আমাকে ঘিরে। শামীমের বাসায় ২০০৮ সালের সেই অষ্টপ্রহর আড্ডার স্মৃতি আমি কখনও ভুলবো না। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমি আবারও বুঝেছিলাম যে, তরুণ কবিদের ভালোবাসা ডাবের জলের মতো, বাইরে যতই দূষণ থাক, অন্তরের সেই জল শুদ্ধ ও নির্মল।
সেই উদ্বুদ্ধ, উদ্বেল সফরেই আমার মনে এক অসম্ভব ইচ্ছা জেগেছিল। এপার বাংলা-ওপার বাংলা নয়, শুধু বাংলাদেশের কবিদের কবিতার একটি বৃহৎ সংকলন সম্পাদনার ইচ্ছা। সে কাজ আমার একার সাধ্য নয়। সঙ্গী হওয়ার জন্য প্রস্তাব দিলাম কবিবন্ধু সাজ্জাদ শরিফকে। সে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। বাকিটা যাকে বলে ইতিহাস। ২০০৯ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসে কলকাতায় কবি শঙ্খ ঘোষের হাতে আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটল সংকলনটির। এবং আজ ঠিক এগারো বছর পর, চারটি সংস্করণ পেরিয়ে, এই সংকলনটি বাংলা কবিতার এক অদ্বিতীয় বেস্টসেলার! সেই সঙ্গে, আজ এই সংকলনটি পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের পাঠ্যসূচিতে গৃহীত ও সমাদৃত। এই সংকলন আমার ক্ষুদ্র কবিজীবনের এক শ্রেষ্ঠ কাজ বলে আমি মনে করি। সেই ২০০৮ সালে শামীমের ফ্ল্যাটে বসেই এই সংকলনটি করার স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি। এ জন্য আমি শামীমের কাছে কৃতজ্ঞ।
সেই থেকে শামীমের সঙ্গে আমার দীর্ঘকালীন হৃদ্যতার শুরু। ভীষণ কর্মঠ ও উদ্যোগী ছেলে শামীম, এক সংরক্ত মেধাবী পড়ূয়া ও তথ্য সন্ধানী, সারাক্ষণ কাব্যসাহিত্যের নতুন-নতুনতর চিন্তায় উদ্দীপ্ত। কবি হিসেবে সে নিরন্তর সাহসী নিরীক্ষায় আগ্রহী এবং দেশ-কালের প্রেক্ষিতে নিজের কবিকণ্ঠের স্বকীয়তা নির্মাণে তৎপর। সব কাজেই মনন তার প্যাশন, যা ভালো লাগে আমার।
এর পরেও কয়েকবার শামীমের উদ্যোগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে বাংলাদেশে গিয়েছি আমি, এবং আমার পূর্বপুরুষদের বাসভূমির জল-মাটি-মানুষের স্পর্শ পেয়ে আমার মন সঞ্জীবিত হয়েছে। বিশেষত মনে পড়ে ২০১৪ সালের বর্ষায় 'জেমকন' পুরস্কারের অন্যতম বিচারক হয়ে আমার ঢাকা সফরের কথা। সেবার অনুষ্ঠান শেষে শামীমই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল আমার একটি দীর্ঘকালীন স্বপ্নপূরণের- জীবনানন্দের জন্ম শহর বরিশালের তীর্থদর্শনের। শামীম নিজে বরিশালের ছেলে, প্রতি পদে 'বরিশাইল্যা' তেজ ও আবেগ তার রক্তে, কিন্তু কিছু জরুরি কাজের জন্য সে আমার তীর্থযাত্রার সঙ্গী হতে পারেনি। তাই সেই অসামান্য ঢাকা থেকে বরিশাল নৈশ স্টিমার ভ্রমণে সে আমার সঙ্গী হিসেবে দিয়েছিল এক রহস্যময় তরুণ কবিকে, যার নাম জাহিদ সোহাগ (এবং বরিশালে আমার গাইড হিসেবে ঠিক করে দিয়েছিল বিশিষ্ট কবি হেনরি স্বপনকে, যার সঙ্গ ছিল অতুলনীয়!) ঘোর বর্ষায়, বিপুল মেঘাচ্ছন্ন আকাশের বুকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকে এবং উত্তাল নদীবক্ষের রোমাঞ্চকর যাত্রায়, তেরছা বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে স্টিমারের ডেকে দাঁড়িয়ে, সেই বিশাল ক্রুদ্ধ, অভিমানী নদীজলে আমি দেখেছিলাম বাংলার মুখ। আমি বুঝেছিলাম, ভৌগোলিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে, একটি নদীমাতৃক দেশ কাকে বলে। আমি ধন্য হয়েছিলাম।
এবার কথা গোটাই শামীম। জীবনের খেলায় বড় দ্রুত হাফ সেঞ্চুরিতে পৌঁছে গেলে তুমি। এই খেলায়, উদীয়মান বাংলাদেশের উইকেট বড় সবুজ ঘাসে ভরা, যাতে বলের গতি ও বাউন্স দুই-ই দুরন্ত! এতে তোমার সেঞ্চুরি অবশ্যই চাই। আগাম শুভেচ্ছা রইল। কারণ তখন আমি থাকবো না!