মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। তবে ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতিতে কিছুটা এগিয়ে আছে। ইন্টারনেটের গতি পর্যবেক্ষণে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান 'স্পিডটেস্টে'র সর্বশেষ সূচকের তথ্যে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
এ সূচকের তথ্য সম্পর্কে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেছেন, এ চিত্র অবাস্তব নয়; বরং এটিই প্রত্যাশিত এবং এখনকার বাস্তবতা। কারণ বাংলাদেশে গ্রাহকের তুলনায় মোবাইল অপারেটরদের বেতার তরঙ্গ ব্যবহারের পরিমাণ কম। একই সঙ্গে বিগত বছরে দেশে ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। কিন্তু বেতার তরঙ্গের ব্যবহার সে অনুপাতে বাড়েনি। এ কারণেই মোবাইল ইন্টারনেটের গতি স্বাভাবিকভাবেই কমে গেছে। তিনি জানান, আগামী ৮ মার্চ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসি আরও একটি বেতার তরঙ্গ নিলাম করতে যাচ্ছে। বিভিন্ন ব্যান্ডে অব্যবহূত বেতার তরঙ্গ যা আছে তার ওপরই এ নিলাম হবে। এই নিলামের মাধ্যমে মোবাইল অপারেটররা আরও কিছু বেতার তরঙ্গ কেনার সুযোগ পাবে। ফলে এপ্রিলের পর মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে উন্নতি হবে। এ ছাড়া মোবাইল অপারেটররা কথা দিয়েছে, চলতি মাসের মধ্যেই দেশের ৮০ শতাংশ ফোরজি নেটওয়ার্ক সেবার আওতায় নিয়ে আসবে তারা। নতুন বেতার তরঙ্গ যোগ হলে গ্রাহকসেবার মানও আনুপাতিক হারে বাড়বে। তবে সরকারের মূল লক্ষ্য সারাদেশে ব্রডব্যান্ড সংযোগ আরও বেশি বিস্তৃত করা। এ জন্যই বড় কাজ হচ্ছে।
এরই মধ্যে দেশের ইউনিয়ন পর্যন্ত ফাইবার অপটিক কেবল নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার কাজ শেষ হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্পিডটেস্ট সূচক :গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বের ১৭৫টি দেশের মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতির তথ্য নিয়ে সর্বশেষ সূচক প্রকাশ করেছে বিশ্বখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা স্পিডটেস্ট।
এতে দেখা যায়, মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৬তম। আর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৬তম। বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের গড় ডাউনলোড গতি ১০ দশমিক ৫৭ এমবিপিএস, আপলোড ৭ দশমিক ১৯ এমবিপিএস। আর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গড় ডাউনলোড গতি ৩৩ দশমিক ৫৪ এমবিপিএস, আর আপলোডের গড় গতি ৩৩ দশমিক ৯৬ এমবিপিএস।
সূচক মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মালদ্বীপ। এই গতির বৈশ্বিক অবস্থানে ৪৫ নম্বরে থাকা দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেটে গড় ডাউনলোড গতি ৪৪ দশমিক ৩০ এমবিপিএস এবং আপলোডের গড় গতি ১৩ দশমিক ৮৩ এমবিপিএস। মালদ্বীপে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ডাউনলোডের গড় গতি ২৪ দশমিক ৫০ এমবিবিপিএস এবং আপলোডে গড় গতি ১৫ দশমিক ৭৫ এমবিপিএস।
মালদ্বীপের পরই এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে স্থান মিয়ানমারের। বৈশ্বিক তালিকায় ৮৮ নম্বরে থাকা দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেটে ডাউনলোডের গড় গতি ২৫ দশমিক ২১ এমবিপিএস এবং ডাউনলোড ১৬ দশমিক ৭০ এমবিপিএস।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে মিয়ানমারে গড় ডাউনলোডের গতি ২১ দশমিক ৭৩ এমবিবিএস এবং আপলোডের গতি ২০ দশমিক ৪৬ এমবিপিএস।
দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্টারনেটের গতিতে তৃতীয় স্থানে আছে নেপাল। তালিকায় ১১৪ নম্বরে থাকা দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেটে ডাউনলোডে গড় গতি ১৮ দশমিক ৪৪ এমবিবিপিএস এবং আপলোডে ১১ দশমিক ৭৩ এমবিপিএস। নেপালে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে গড় ডাউনলোডের গতি ২৪ দশমিক ৮৬ এমবিপিএস এবং গড় আপলোড ২৩ দশমিক ০১ এমবিপিএস।
সূচকে ১১৮ নম্বরে আছে পাকিস্তান। দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেটে গড় ডাউনলোডের গতি ১৭ দশমিক ৭৯ এমবিবিপিএস এবং আপলোডের গড় গতি ১১ দশমিক ১৬ এমবিবিপিএস। এ দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে গড় ডাউনলোডের গতি ১০ দশমিক ৮৪ এমবিপিএস এবং আপলোডের গড় গতি ৯ দশমিক ৫৫ এমবিপিএস।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ঠিক আগে অবস্থান ভারতের। বৈশ্বিক তালিকায় ১৩১ নম্বরে থাকা ভারতের মোবাইল ইন্টারনেটের গড় ডাউনলোড গতি ১২ দশমিক ৪১ এমবিপিএস এবং গড় আপলোডের গতি ৪ দশমিক ৭৬ এমবিপিএস। তবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে ভারত। দেশটিতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ডাউনলোডের গড় গতি ৫৪ দশমিক ৭৩ এমবিবিপিএস এবং আপলোডে গড় গতি ৫১ দশমিক ৩৩ এমবিবিপিএস।
বৈশ্বিক সূচকে মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে এ বছর শীর্ষে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেটে ডাউনলোডের গড় গতি ১৮৩ দশমিক শূন্য ৩ এমবিপিএস এবং গড় আপলোডর গতি ২৯ দশমিক ৫০ এমবিপিএস। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ডাউনলোডে গড় গতি ১২৯ দশমিক ৪৩ এমবিপিএস এবং আপলোডের গতি ৬০ দশমিক ৫৪ এমবিপিএস। তালিকায় দুই নম্বরে আছে দক্ষিণ কোরিয়া এবং তিন নম্বরে আছে কাতার। চার নম্বরে আছে চীন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সূচকে অবস্থান ২০তম। তথ্যপ্রযুক্তির অন্যতম আঁতুরঘর হিসেবে পরিচিত জাপানের অবস্থান ৫১তম। তালিকায় সর্বনিম্ন স্থানে আছে পূর্ব ইউরোপের দেশ তুর্কমেনিস্তান।
অ্যামটবের বক্তব্য :এ ব্যাপারে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফরহাদ সমকালকে জানান, মহামারির সময়ে মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যবহার অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে সেবার মানে প্রভাব ফেলেছে। তবে প্রায় ১০ দশমিক ৫০ এমবিপিএস গতি ফোরজি সেবায় ভালো অবস্থা হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। তিনি বলেন, অপারেটররা স্পেকট্রামের ঘাটতি, লাইসেন্স বিভাজনসহ বেশকিছু অমীমাংসিত সমস্যার মধ্যেও মানসম্মত সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সঠিক নীতি, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিস্থিতি গ্রাহক সেবার মানকে আরও উন্নত করতে পারে।

মন্তব্য করুন