কভিড-১৯ মহামারির বছরে তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বাজারের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহামারির বছরে সুস্পষ্ট আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে দেশটি। বিপরীতে বাজার হারিয়েছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছিল যুক্তরাষ্ট্র; এগিয়ে গিয়েছিল চীন। কিন্তু ২০২০ সালে মহামারির বাজারেই কয়েক মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার হারানো বাজার ফিরে পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা স্ট্যাটিসটার সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক (৩১ মার্চ) পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কেট শেয়ার ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা ছিল ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৯ সালে চীনের মার্কেট শেয়ার ছিল ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। মহামারির প্রথম বছর শেষে চীনের মার্কেট শেয়ার নেমে এসেছে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে।

বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তির বাজার-সংক্রান্ত একাধিক গবেষণা সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, ক্লাউড বা ওয়েব সার্ভিস, স্মার্ট ডিভাইস, ই-কমার্সসহ তথ্যপ্রযুক্তি বাজারে আধিপত্য ফিরে পেয়েছে মার্কিন কোম্পানিগুলো। মহামারির আগে ৬০ মিলিয়ন ডলারের কোম্পানি 'জুম' এক বছরেই পরিণত হয়েছে ৩২৮ মিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে। অ্যামাজনের ওয়েব সার্ভিসের আয় ১০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ১২৫ বিলিয়ন ডলার।

২০০৭ সাল পর্যন্ত বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ বাজারে একক আধিপত্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ২০০৮ সালের শুরু থেকে কয়েকটি চীনা কোম্পানির বিস্ময়কর উত্থানে পিছিয়ে পড়তে থাকে মার্কিন কোম্পানিগুলো। ওই সময় টেলিযোগাযোগ ট্রান্সমিশন যন্ত্রপাতি বিক্রিতে চীনের কোম্পানি হুয়াওয়ে ও জেডটিই ৪৩ শতাংশ বাজার দখল করে ফেলে। ল্যাপটপ বিক্রিতে শীর্ষে চলে আসে চীনে জন্ম নেওয়া ও হংকং থেকে পরিচালিত কোম্পানি লেনোভো। অন্যদিকে ই-কমার্স ও ওয়েব সার্ভিসে আলিবাবা শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজনকে, পেছনে ফেলে দেয় ওয়ালমার্টকে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছিল এমন চিত্র। মহামারির সময় সেই চিত্র বদলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্ববাজার পরিসংখ্যানে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত স্ট্যাটিসটার সর্বশেষ প্রতিবেদনে (প্রথম প্রান্তিক, ৩১ মার্চ পর্যন্ত) বলা হয়েছে, বর্তমানে সার্বিকভাবে বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কেট শেয়ার ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে ১৫ শতাংশ বাজার দখলে রেখেছে সম্মিলিতভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। আর এককভাবে ১১ শতাংশ বাজার নিয়ে চীনের অবস্থান তৃতীয়।

২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের একক অংশীদারিত্ব ছিল ৩১ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর দখলে ছিল ২০ শতাংশ, আর চীনের একক বাজার অংশীদারিত্ব ছিল ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৯ সালেও যুক্তরাষ্ট্রে অংশীদারিত্ব ছিল ৩১ শতাংশ, চীনের ছিল ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ, আর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ছিল ১৯ দশিক ১ শতাংশ। কিন্তু মহামারির বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব এক লাফে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে যায়, আর চীনের কমে যায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ। এই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাজার হারিয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ।

আয়, বিক্রি বেড়েছে জ্যামিতিক হারে: গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিসটা, কাউন্টার পয়েন্ট, স্ট্যাটকাউন্টার, ই-মার্কেটার, গার্টনার ও পার্কমাইক্লাউডের তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, মহামারির বছরে অন্যান্য ক্ষেত্রে বিক্রিতে যতই ধস নামুক, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে।

কাউন্টারপয়েন্টের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ল্যাপটপ বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ মিলিয়ন ইউনিট। মহামারির বছরে বিক্রির পরিমাণ এক লাফে ১৩ মিলিয়ন ইউনিট বেড়ে হয় ১৭৩ মিলিয়ন ইউনিট।

গার্টনারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে লেনোভোর মার্কেট শেয়ার দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ১ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এইচপির মার্কেট শেয়ার ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। আগের বছরের প্রথম প্রান্তিকে লেনোভোর মার্কেট শেয়ার ছিল ২৩ দশিক ৩ শতাংশ; আর এইচপির ২১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোম্পানি ডেলের মার্কেট শেয়ার এই এক বছরে ১৬ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ফলে এইচপি আর ডেল মিলে হিসাব করলে বিশ্বের ল্যাপটপ বাজারে সার্বিকভাবে (৪০ দশমিক ৪ শতাংশ) যুক্তরাষ্ট্রেরই আধিপত্য রয়েছে। মহামারির বছরে তাইওয়ানের কোম্পানি আসুসের মার্কেট শেয়ার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে।

পার্কমাইক্লাউডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্ব ওয়েব সার্ভিস ও ক্লাউডের বাজারে এক নম্বরে আছে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিস (এডব্লিউএস)। আগের তিন বছরে প্রথম প্রান্তিকে অ্যামাজনের ওয়েব সার্ভিসের গড় আয় ছিল ৯০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে এই আয়ের পরিমাণ এক লাফে ১২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে। আগের বছরগুলোতে গড়ে ১০ শতাংশ হারে রাজস্ব বাড়লেও ২০২০ সালে রাজস্ব বেড়েছে এক লাফে ৪৪ শতাংশ। অ্যামাজনের পরে দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠান আজুরি। এটির আয় আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেড়ে ১৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগের তিন বছরে আয়ের পরিমাণ ছিল ১০ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার।

তবে মহামারির বছরে সবচেয়ে বেশি উত্থান হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি জুমের। ব্যাকলিনকোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে এই কোম্পানির আয় ছিল ১২২ মিলিয়ন ডলার। আর ২০১৯ সালে ছিল মাত্র ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১ সাল শেষে কমপক্ষে ৮০০ মিলিয়ন ডলার আয় করার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ই-মার্কেটারের পরিসংখ্যান বলছে, মহামারির এক বছরে বিশ্ব ই-কমার্সে অর্ডারের পরিমাণ বেড়েছে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অবশ্য বিপুল পরিমাণ অর্ডারের বিপরীতে ডেলিভারি না করায় সার্বিকভাবে বিক্রি কমেছে ৩ শতাংশ। মহামারির বছরে বিশ্ব ই-কমার্স বাজারে রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার। মনে করা হচ্ছে, ২০২১ সালে কমপক্ষে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার আয় করবে। বর্তমানে বিশ্ব ই-কমার্সের মোট বাজারের আকার ২৩ দশমিক ৮৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এ বাজারে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজন এক নম্বরে রয়েছে। বিপরীতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের আলিবাবার আয় সামান্য কমেছে।

স্ট্যাটকাউন্টারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্মার্টফোনের বাজারে মাহমারির বছরে যথারীতি শীর্ষে আছে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং (মার্কেট শেয়ার ২৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ)। দ্বিতীয় স্থানে অ্যাপলের আইফোন (২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ) এবং তৃতীয় স্থানে আছে চীনের শাওমি (১০ দশমিক ৩ শতাংশ)। স্মার্টফোনে চীনের কোম্পানি হুয়াওয়ের মার্কেট শেয়ার ৯ দশকি ২ শতাংশ, অপোর ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ভিভোর ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

মন্তব্য করুন