ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, বাজারে সবারই স্বাধীনভাবে ব্যবসার অধিকার থাকবে। কিন্তু কেউ যেন এককভাবে দানব হয়ে না ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার। শনিবার বিকেলে ‘প্রতিযোগিতা ও অংশীদারিত্ব: প্রসঙ্গ এমএফএস’ শিরোনামে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সাংবাদিকদের সংগঠন টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক’ বাংলাদেশ-টিআরএনবি এ সেমিনারের আয়োজন করে। টিআরএনবি’র সভাপতি রাশেদ মেহেদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে আলোচনায় আরও অংশ নেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান শ্যামসুন্দর সিকদার, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম,বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্টের উপ-মহাব্যবস্থাপক বদিউজ্জামান, অ্যামটব সভাপতি ও রবি'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, ডাচ বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আবুল কাশেম মোহাম্মদ শিরিন, ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা ‘নগদ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক, বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার মিজানুর রশীদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান আলম এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবা বিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার ইফতেখার জোনায়েদ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআরএনবি’র সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার দে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মানুষ ক্রমাগত ডিজিটাল সেবার দিকে ঝুঁকছে। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন ব্যাংকের শাখাগুলোতে আর গ্রাহকদের চেহারা দেখা যাবে না। নগদ অর্থ লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন বাড়বে। এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারও খুব তাড়াতাড়ি শুরু হয়ে যাবে। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে। এ কারণে আমাদের ভবিষ্যতের প্রস্তুতিটাও এখন থেকেই নিতে হবে। প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্তঃলেনদেন ব্যবস্থা আছে। এ ব্যবস্থা এমএফএস (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস) অপারেটরদের মধ্যেও চালু করতে হবে। সময়োপযোগী উদ্ভাবন ছাড়া কেউ বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

তিনি বলেন, ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহক স্বার্থ রক্ষায় একই প্রাধান্য দিতে হবে। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদের স্বাধীনভাবে ব্যবসার অধিকার দিতে হবে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার মনে রাখতে হবে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যেন বাজারে এককভাবে দানব না হয়ে ওঠে। বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য সরকার আরও আগেই আইন করেছে। প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সেই আইনের আলোকে ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে প্রতি হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারিত। কিন্তু গ্রাহককে ২০ টাকা দিতে বাধ্য করেন এজেন্টরা। এটা একজনের ক্ষেত্রে অগ্রাহ্য করা গেলেও দিনে লাখ লাখ লেনদেনের হিসাব করলে বিপুল টাকা। এই অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার মাধ্যমে চুরি হচ্ছে। গ্রাহকরা প্রতারিত হচ্ছেন। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।

তিনি বলেন, ডাক বিভাগের ডিজিটাল সেবা নগদই প্রথম এসএফএস-এর বাজারে একচেটিয়াত্ব বা মনোপলি ভেঙ্গে দেয়। তারপরও এখনও এ খাতে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান আছে। বিটিআরসি মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে সুস্থ প্রতিযোগিতার স্বার্থে আইন অনুযায়ী এমএনপি (সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার) শর্ত আরোপ করেছে। প্রয়োজন হলে এমএফএস খাতেও এ ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, বাজারে কোনো খাতে যদি মনোপলি হয়, তাহলে প্রতিযোগিতা কমিশনের কাছে অভিযোগ দিলে তার প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে কমিশন এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পায়নি। তবে কমিশন নিজস্ব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও ব্যবস্থা নিতে পারে। কমিশন অবশ্যই বাজারের সুস্থ প্রতিযোগিতার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম বলেন, মোবাইলে আর্থিক লেনদেনে হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারিত ফি। এটা কোনো এজেন্টের সামনেই প্রদর্শন করা হয় না। এটা প্রদর্শন করা কি খুব কঠিন কাজ?

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা আছে,এমএফএস লেনদেনে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো চার্জ নেওয়া যাবে না। কোনো অপারেটর এ নির্দেশনা মানছে, কেউ মানছে না। এটা নিশ্চিত করবে কে?

অনুষ্ঠানে অ্যামটব সভাপকি ও রবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সেবার মূল্য যত কমবে, তত ব্যবহার বাড়বে। এ কারণে সুলভে সেবা দিয়ে বেশি গ্রাহকের কাছে যাওয়ার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, অদূর ভবিষ্যতে ডিজিটাল মুদ্রা আসবে, এটাই বাস্তবতা।

ডাচ বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রতি গ্রাহকের আগ্রহ বাড়ছে। কারণ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো প্রতি হাজারে দুই থেকে তিন টাকা মাশুল নেয়। কিন্তু সেবায় মাশুল অনেক বেশি। এ কারণে এ মাশুলের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, নগদ যাত্রার শুরু থেকেই সুলভে সেবার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অ্যাকাউন্ট খোলা এবং একেবারে কম খরচে লেনদেন নিশ্চিত করেছে। টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে নগত কোনো ফি নেয় না। টাকা তোলার ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে ২০ টাকা ফি দুনিয়ার আর কোনো দেশে নেই।

বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার বলেন, যদি লেনদেন ফি বাস্তবতার বিচারে পুনঃনির্ধারণ করা হয়, সেটা নিয়ে আপত্তি থাকবে না। তবে কোনো হঠকারি সিদ্ধান্ত যেন না নেওয়া হয়।

বিআইবিএম-এর সহযোগী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান আলম বলেন, সাত হাজারের মতো ব্যবহারকারীর ওপর জরিপ করে তারা দেখেছেন, মানুষ ২ শতাংশ হারে ফি নিয়ে খুব বেশি ভাবে না। তবে প্রতি লেনদেনে দেড় টাকা বেশি নেওয়ায় তারা বিরক্ত।

ব্যারিস্টার ইফতেখার জোনায়েদ বলেন, বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন আছে। ২০১২ সালেই প্রতিযোগিতা আইন সংসদে গৃহীত হয়। কিন্তু আইনটির যথাযথ প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।