আমরা করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে আছি। দীর্ঘদিন ধরে চলমান করোনার বিরূপ প্রভাব পড়েছে সমাজদেহের নানা দিকে। এর অভিঘাতের অনেক দাগই সুস্পষ্ট। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিরূপতা সমাজে যে আরও প্রকট হয়ে উঠবে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। এই বাস্তবতায় যে রকম বাজেট প্রত্যাশিত ছিল তা আমরা পাইনি। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা বাজেটে আছে? সাধারণের কর ছাড় চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত হলেও এ ক্ষেত্রে সুসংবাদ মেলেনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য নেই সুবার্তা। বলতে গেলে বাজেটে এই শ্রেণির দিকে দৃষ্টিপাত সেভাবে করাই হয়নি। করোনা-দুর্যোগে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই শ্রেণিভুক্ত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে। তারা প্রস্তাবিত বাজেটে উপেক্ষিতই থেকে গেল। তবে বাজেট সংশোধনের সুযোগ রয়েছে যা ভাবা জরুরি।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির উল্লেখযোগ্য একটা অংশের বড় অবলম্বন সঞ্চয়পত্র। সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টিও আমলের বাইরে থেকে গেল। সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে টিআইএনের ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা নিয়ে প্রশ্ন ছিলই। টিআইএনের সঙ্গে করের বিষয়টি সংশ্নিষ্ট। চলমান মহামারিকালে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয়-রোজগার শুধু কমেইনি, অনেকে জীবনযাপনের ক্ষেত্র অতিসংকুচিত করেছেন। এই শ্রেণিভুক্ত বিপুল মানুষের কথা কেন ভাবা হলো না; কেন নতুন দরিদ্রের জন্য সুস্পষ্ট কিছুই উল্লেখ করা হলো না তা বোধগম্য নয়। গাণিতিক হিসাবের বাজেটের বাইরে বাস্তবতার নিরিখে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপিত হবে- এ-ই ছিল সাধারণ সচেতন জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতা শেষ করেছেন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার আশা পোষণ করে। কিন্তু শুধু আশা পোষণ করলেই জনকল্যাণকর কাজগুলো বাস্তবায়িত হয়ে যাবে না, যদি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনামূলক কিছু না থাকে। এ জন্যই বলা যায়, প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে বিদ্যমান বাস্তবতার ফারাক ব্যাপক।
বাস্তবতাবিবর্জিত, কল্পনাপ্রসূত, উচ্চাভিলাষী- এই শব্দগুলো আমাদের বাজেটের আগে-পরে বারবারই আলোচনার কেন্দ্রে থেকে যায়। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু মহামারিকালে দারিদ্র্যের ব্যাপারে যতগুলো জরিপ এ পর্যন্ত হয়েছে, এর প্রায় প্রত্যেক জরিপেই উঠে এসেছে দারিদ্র্যের হার আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে; এমনকি তা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে পর্যন্ত গিয়ে ঠেকতে পারে। তাহলে ফল কী দাঁড়াল? অর্থমন্ত্রীর আশাবাদ আর বাস্তবতার নিরিখে পরিচালিত প্রায় সব জরিপের ফলাফল মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। তাছাড়া এসব ব্যাপারে যে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপিত হয়েছে তাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, আয়, স্বাস্থ্যসেবা- এই বিষয়গুলো এ সময়ে অতিগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও যা বলা হয়েছে তা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারেরই সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান চিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যুব প্রশিক্ষণের পরিসর বাড়ানো হবে, তা ভালো কথা; কিন্তু তাদের কর্মসংস্থানের কী হবে, এর সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই।
আমরা যে অর্থবছরটি অতিক্রম করলাম তা দুর্বলতম- এ কথা অনেক অর্থনীতিবিদই বলেছেন। রাষ্ট্রীয় ব্যয় হ্রাস, এডিপির বাস্তবায়ন এগুলোও নেতিবাচক আলোচনায় রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এরই মধ্যে অনেক কিছুই দেখা গেছে, যা বিস্ময়করভাবে কদর্য। হাসপাতালগুলোতে নানামুখী সংকটের পাশাপাশি করোনা চিকিৎসা ও সুরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এমন চিত্রও দেখা গেছে, যা এক কথায় বলা যায় লুটপাটের ভয়াবহ রূপ। রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হলেও ব্যয়ের নানা দিক নিয়েই প্রশ্ন আছে। আমাদের বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যয়চিত্র অর্থবছরের শেষে উঠে আসে না। কথায় কথায় প্রবৃদ্ধি নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা হয়। কিন্তু বিদ্যমান করোনা-দুর্যোগে প্রবৃদ্ধি নিয়ে এত আত্মতুষ্টির সুযোগ আছে কি? করোনা-দুর্যোগে অন্য খাত তো আছেই, অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে কিংবা আরও হওয়ার আশঙ্কা আছে, এর ধকল কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। তাছাড়া করোনার তৃতীয় ঢেউ যে আমাদের আক্রান্ত করবে না- এরই-বা নিশ্চয়তা কী? বিশ্বের অনেক দেশেই তো এরই মধ্যে তা-ই দেখেছি।
করোনাভাইরাসের প্রতিরোধক ভ্যাকসিন দেওয়ার প্রক্রিয়া মন্থর। কারণ ভ্যাকসিন সংগ্রহের আনুপাতিক হার এখন পর্যন্ত চাহিদার নিরিখে একেবারেই অপ্রতুল। নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীলদের এ ক্ষেত্রে নানারকম ব্যর্থতা-অদূরদর্শিতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমসহ নানা মহলে এ পর্যন্ত অনেক আলোচনাই হয়েছে। ৮০ ভাগ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার কথা জাতীয় বাজেটে বলা হয়েছে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতার ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। জনস্বাস্থ্যবিদরা দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনের ব্যাপারে জোর দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্নিষ্ট মহলের চিন্তাভাবনার গতি এতই মন্থর, যার ফলে আমাদের ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতার সুযোগটা সময়মতো কাজে লাগাতে পারিনি। গ্লোব বায়োটেক কোম্পানি 'বঙ্গভ্যাক্স' ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য অনুমতির প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি দীর্ঘদিনেও। সবকিছু মিলিয়ে বাজেট হওয়া উচিত ছিল করোনা মোকাবিলায় অগ্রাধিকার দিয়ে। ভ্যাকসিনের বিষয়টি চলমান মহামারিকালে অত্যধিক গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়ই বটে। ভ্যাকসিনের আওতায় দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে না এনে প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে এত কথা শুনিয়ে কী লাভ?

অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম দিয়েছেন, 'জীবন-জীবিকার প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ'। নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া শিরোনাম। শুনলে স্বস্তিই মেলে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- জীবন-জীবিকা বাঁচানোর এমন কী পরিকল্পনা রয়েছে বাজেটে? ব্যবসায়ীরা প্রস্তাবিত বাজেটে খুশি হয়েছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটুক তা আমরাও চাই। কিন্তু সেই আদিকালের মতোই বর্তমানের বাস্তবতায়ও যদি চিন্তা করা হয় যে নানারকম সুযোগ পেয়ে ব্যবসায়ীরা তাদের উদ্যোগের ক্ষেত্র বিস্তৃত করবেন এবং এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে, এমন চিন্তা কতটা দূরদর্শী তা ভাবার বিষয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তাভাবনার ক্ষেত্র এত গণ্ডিবদ্ধ রাখাটা সমীচীন হয়েছে বলে মোটেও মনে করি না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিগত কয়েক বছরে বেশ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারিসহ এমন কিছু নেতিবাচক কর্মকাণ্ড করেছেন, যার বিরূপ প্রভাব অর্থনীতিকে ধাক্কা তো দিয়েছেই; একই সঙ্গে সৎ ব্যবসায়ীদের জন্যও তা অস্বস্তির কারণ হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতসহ সরাসরি জনস্বার্থ-সংশ্নিষ্ট এবং জনগুরুত্বপূর্ণ যেমন সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ইত্যাদি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোই শেষ কথা নয়। এই প্রত্যেকটি খাতেই অনিয়মের নানা চিত্র এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে বরাদ্দ লুটেপুটে খাবে অসাধুরা। এ জন্যই সংস্কারের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্মোহ ও কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। আমাদের বাজারচিত্র এবং এ ক্ষেত্রে মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। বাজেটের পর বাজারে ঊর্ধ্বগতি সব সময়ই লক্ষ্য করা গেছে। যেসব পণ্যের ওপর শুল্ক্কারোপ করা হয়নি, সেসব পণ্যেরও দাম বেড়ে যায়। তবে দেশি পণ্যের সুরক্ষা বা স্থানীয়ভাবে পণ্য উৎপাদনে উৎসাহের ইতিবাচক প্রভাব আশা করা যায়। প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না রাখা হলেও বাজেট ঘোষণা-পরবর্তী অর্থমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে একটা 'কিন্তু'র আভাস রয়েছে। কালো টাকা ও অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার বরাবরই আমরা বিপক্ষে। যেসব দিকে ঘাটতি রয়েছে সংশোধিত বাজেটে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে- এ প্রত্যাশা রাখি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

বিষয় : অর্থনীতি এম হাফিজ উদ্দিন খান

মন্তব্য করুন