চলতি বছরের মে মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো যখন আফগানিস্তান থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার কাজ শুরু করে, তালেবান তখনই আফগানিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ওপর সামরিক আক্রমণ জোরদার করতে শুরু করে। একইসঙ্গে তারা সোশ্যাল মিডিয়াতেও তাদের পক্ষে একযোগে প্রচার-প্রচারণা চালাতে শুরু করে।

সোশ্যাল মিডিয়ার বেশ কিছু অ্যাকাউন্টের একটি নেটওয়ার্ক থেকে তালেবান কাবুল সরকারের কথিত ব্যর্থতার কথা তুলে ধরতে শুরু করে। একইসঙ্গে এসব অ্যাকাউন্ট থেকে তালেবানের বিভিন্ন ধরনের অর্জন ও সাফল্যের কথাও তুলে ধরা হয়। খবর বিবিসির

তালেবানের সাম্প্রতিক কিছু বিজয়ের কথাও পোস্ট করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কখনও কখনও বিজয়ের আগেভাগেই। এজন্য তারা টুইটারে নানা ধরনের হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করতে শুরু করে যার মধ্যে রয়েছে #kabulregimecrimes, যেখানে আফগান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলা হয়।

আরো একটি হ্যাশট্যাগ #westandwithTaliban ব্যবহার করে আফগানিস্তানের তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এক পর্যায়ে আফগানিস্তানে এই হ্যাশট্যাগগুলো বহুল প্রচার প্রায় বা ট্রেন্ড করতে শুরু করে।

এসবের জবাবে আফগানিস্তানের সাবেক সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ তার বাহিনী এবং জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তারা যেন সোশ্যাল মিডিয়ায় তালেবানের বিজয়ের এসব মিথ্যা দাবি বিশ্বাস না করেন।

একইসঙ্গে তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান, সামরিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য যাতে তারা প্রকাশ না করেন। কারণ এর ফলে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

তালেবানের সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার থেকে ধারণা করা যায়, যে গ্রুপটি একসময় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং গণমাধ্যমের তীব্র বিরোধিতা করতো সেখান থেকে তারা সরে এসেছে। শুধু তাই নয়, তাদের বার্তা ও খবর আরও বহুগুণে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তারা সোশ্যাল মিডিয়াকেও ব্যবহার করতে শুরু করেছে।

তালেবান যখন ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল, তারা ইন্টারনেট নিষিদ্ধ করেছিল। জব্দ করেছিল টেলিভিশন সেট, ক্যামেরা ও ভিডিও টেপ। 

কিন্তু ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ারও চার বছর পরে  ২০০৫ সালে ইসলামিক এমিরেটস অফ তালেবানের একটি ওয়েবসাইট 'আল-এমারাহ' চালু করা হয়। এখন সেই ওয়েবসাইটে ইংরেজি, আরবি, পাশতু, দারি এবং উর্দু- এই পাঁচটি ভাষায় তাদের খবর প্রকাশ করা হয়।

এসবের মধ্যে রয়েছে অডিও, ভিডিও এবং বিভিন্ন ধরনের লেখা। তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদের নেতৃত্বে ইসলামিক এমিরেটস অফ আফগানিস্তানের সাংস্কৃতিক বিভাগ এসব পরিচালনা করে।

জাবিউল্লাহ মুজাহিদের প্রথম অ্যাকাউন্টটি টুইটার বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে তার এখনকার নতুন অ্যাকাউন্ট, যেটি ২০১৭ সাল থেকে সক্রিয়, সেখানে তার তিন লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি অনুসারী রয়েছে।

তার পেছনে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবীদের একটি বিশেষ দল যারা অনলাইনে তালেবানের আদর্শ ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে বাহিনীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে।

এই গ্রুপের প্রধান হিসেবে যার নাম শোনা যায় তিনি কারী সাঈদ খস্তি। তিনি ইসলামিক এমিরেটস অফ আফগানিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়া বিষয়ক পরিচালক।

খস্তি বিবিসিকে বলেন, এই টিমের রয়েছে আলাদা আলাদা গ্রুপ যারা টুইটারে হ্যাশট্যাগের ট্রেন্ডিং এবং হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকে তালেবানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে। আমাদের শত্রুদের কাছে টেলিভিশন, রেডিও এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট আছে। কিন্তু আমাদের কিছুই নেই। তার পরেও আমরা টুইটার ও ফেসবুকে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি এবং তাদের পরাজিত করেছি।

তিনি বলেন, তার কাজ হচ্ছে আদর্শের কারণে যারা তালেবানে যোগ দিয়েছে তাদের সোশ্যাল মিডিয়াতে নিয়ে আসা যাতে করে তারা আমাদের বার্তা বহুগুণে ছড়িয়ে দিতে পারে।

আফগানিস্তানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮৬ লাখের মতো। দেশটিতে খুব কম জায়গাতেই নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় এবং সাধারণ মানুষের কাছেও ডেটা খুব একটা সহজলভ্য নয়।

ইসলামিক এমিরেটস অফ আফগানিস্তানের মিডিয়া টিম তার সদস্যদের জন্য ডেটা প্যাকেজের পেছনে প্রতি মাসে খরচ করে ১ হাজার আফগানি বা সাড়ে ১১ ডলার। 

খস্তি বলেন, অনলাইনে যুদ্ধ করার জন্য এই অর্থ খরচ হয়।

তিনি বলেন, ইসলামিক এমিরেটস অফ আফগানিস্তানের চারটি মাল্টিমিডিয়া স্টুডিও রয়েছে। এগুলোতে রয়েছে সব ধরনের যন্ত্রপাতি যা দিয়ে অডিও, ভিডিও এবং ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং কনটেন্ট তৈরি করা হয়।

এসব কনটেন্টের মধ্যে রয়েছে উচ্চ মানসম্পন্ন প্রচারণাধর্মী ভিডিও। এসব ভিডিওতে তালেবানের যোদ্ধাদের বীর হিসেবে তুলে ধরা হয়। একইসঙ্গে তুলে ধরা হয় বিদেশি ও জাতীয় বাহিনীর সঙ্গে তাদের যোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের কথা। ইউটিউব এবং আল-এমারাহ ওয়েবসাইটে এসব ভিডিও পাওয়া যায়।

এই গ্রুপটি তাদের ইচ্ছে মতো টুইটার এবং ইউটিউবে বিভিন্ন বিষয় প্রকাশ করতে পারে কিন্তু ফেসবুকে তাদের সেই স্বাধীনতা নেই। ফেসবুক তালেবানকে চিহ্নিত করেছে ‘বিপজ্জনক সংগঠন’ হিসেবে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যেই তালেবানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও পেজ বন্ধ করে দেয়।

ফেসবুক বলেছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে তালেবানের কনটেন্ট নিষিদ্ধ হওয়া অব্যাহত থাকবে।

খস্তি বলেন, তালেবানের পক্ষে ফেসবুকে তাদের উপস্থিতি বজায় রাখা বেশ কঠিন এবং একারণে তারা টুইটারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর হাক্কানি নেটওয়ার্ককে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে শনাক্ত করলেও এই নেটওয়ার্কে নেতা আনাস হাক্কানির এবং গ্রুপের আরও অনেক সদস্যের টুইটারে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তাদের রয়েছে হাজার হাজার অনুসারীও।

তালেবানের সোশ্যাল মিডিয়া টিমের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেছেন, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তালেবানের উপনেতা সিরাজউদ্দিন হাক্কানির একটি মতামতধর্মী নিবন্ধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাদের দল টুইটার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

টুইটারে তালেবানের যত অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রয়েছে তার বেশিরভাগই এর পরে খোলা হয়েছে।

তিনি বলেন, বেশিরভাগ আফগান ইংরেজি বোঝে না, কিন্তু কাবুল সরকারের নেতারা টুইটারে ইংরেজিতে যোগাযোগের ব্যাপারে সক্রিয় ছিলেন। যাদের উদ্দেশ্য করে তারা এসব করছিলেন, তারা আফগান ছিলেন না, তারা ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তালেবান এসব মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিতে চেয়েছিল এবং একারণেই আমরা টুইটারে মনোযোগ দিতে শুরু করি।

তিনি বলেন, টিমের সদস্যদের যাদের কারো কারো হাজার হাজার অনুসারী রয়েছে, তাদের টুইটার ব্যবহারের বিষয়ে বিশেষ কিছু দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে তারা যেন প্রতিবেশী দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে কোনো ধরনের মন্তব্য না করে। কারণ এর ফলে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হতে পারে।