রাজধানীর ধানমন্ডির মেট্রো শপিংমল। শপিংমলটির চারতলার প্রায় পুরোটাই মোবাইল ফোনের মার্কেট, যেখানে রয়েছে ৪০টির বেশি দোকান। এই দোকানগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে, এখানে স্বল্প দামে জনপ্রিয় প্রায় সব ব্র্যান্ডের ফোন পাওয়া যায়। সাশ্রয়ী দামে ভালো ব্র্যান্ডের ফোন কেনা যায় বলে ক্রেতাদের আনাগোনাও বেশি। তবে ফোনগুলো পুরোনো। মেলে বক্স ছাড়া। অর্থাৎ নতুন ফোন যেমন একটি বক্সের মধ্যে ম্যানুয়াল (ব্যবহারবিধি) বই, ওয়ারেন্টি কার্ড, চার্জারসহ পাওয়া যায়, এগুলোর ক্ষেত্রে তা থাকে না, শুধু ফোনটিই পাওয়া যায়। কারণ, এগুলো চোরাই ফোন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চুরি ও ছিনতাই হওয়া ফোন পাচার হয়ে চলে এসেছে বাংলাদেশের বাজারে। কিছু ফোন বক্সসহ মিললেও তা একেবারেই কম।

সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মার্কেটটির প্রায় সব দোকানেই বিক্রি হচ্ছে নামি ব্র্যান্ডের ভারতীয় চোরাই ফোন। শুধু মেট্রো শপিংমল নয়; ধানমন্ডির হ্যাপি আর্কেড শপিংমলের গিজমো এরিনা, মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ার, উত্তরার ট্রপিক্যাল আলাউদ্দিন টাওয়ারে চলছে চোরাই ফোনের রমরমা বাণিজ্য। এ ছাড়া রাজধানীর কেরানীগঞ্জ, সিলেটের করিমুল্লাহ মার্কেট, চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ দেশের বিভিন্ন মার্কেটেও ভারতীয় চোরাই ফোন বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। সমকালের অনুসন্ধানে এসব মার্কেটে ভারতীয় চোরাই ফোন বিক্রির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জানা গেছে, ভারতীয় চোরাই ফোন বিক্রির হাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ। এতে ভারত ও বাংলাদেশের চক্র জড়িত রয়েছে। এই চক্রের হাত ধরে বাংলাদেশে প্রতি মাসে ঢুকছে অন্তত এক লাখ চোরাই মোবাইল ফোন। ভারতীয় চোরাই ফোন বাংলাদেশ হয়ে ব্যাংকক ও সুদানের মতো দেশে যাচ্ছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

কয়েকটি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, মিডরেঞ্জ (মধ্যবর্তী দাম) মানে ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার হ্যান্ডসেট বেশি। কোনোটি পছন্দ হলে দামাদামি করার সুযোগ রয়েছে। দোকানিরা দিচ্ছেন সাত দিনের রিপ্লেস ওয়ারেন্টি এবং এক বছরের বিক্রয়োত্তর সেবা।

মেট্রো শপিংমলের ফোন পার্ক নামে দোকানের বিক্রেতা মেহেদি হাসান বলেন, তাদের দোকানের সব ফোনই ইন্ডিয়ান ভার্সন। কম দামে তারা অনেক ভালো সেট বিক্রি করেন।

ইন্ডিয়ান ভার্সনের ফোনে আইএমইআই-সংক্রান্ত জটিলতা হবে কিনা এমন প্রশ্নের এমএন টেলিকমের বিক্রয়কর্মী ও মেকানিক লিয়াকত হোসেন বলেন, সব ব্যবস্থা করা আছে, কোনো সমস্যা নেই। কী ব্যবস্থা জানতে চাইলে বলেন, আপনার তো এত কিছু জানার দরকার নেই, আপনি ঠিকঠাক মোবাইল ব্যবহার করতে পারছেন কিনা সেটাই আসল।

এ প্রতিবেদক মোবাইল ফোনের দোকানদার সেজে ফোন পার্কের মালিক আল আমিন শেখকে ফোন দিলে তিনি জানান, ইন্ডিয়ান ভার্সনের ফোন যত লাগে দিতে পারবেন, দামও 'ভালো' দেবেন। দামদরসহ বিস্তারিত আলাপের জন্য দোকানে যেতে বলেন তিনি।

দেশে জনপ্রিয় সব ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনের দেখা মিললেও স্যামসাং, শাওমি, ভিভো, অপো ও রিয়েলমি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সমকালকে নিশ্চিত করেছে, বিদেশ থেকে এসব ব্র্যান্ডের ফোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দেশে বৈধভাবে আসার সুযোগ নেই। এদের মধ্যে শাওমি বাদে অন্য সব ব্র্যান্ড দেশেই ফোন তৈরি করছে। স্যামসাং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষও নিশ্চিত করেছে, তাদের ফ্ল্যাগশিপসহ সব ফোনই বাংলাদেশে অ্যাসেম্বল করা।

ভিভো বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ম্যানেজার তানজীব আহমেদ বলেন, সদ্য উন্মোচিত হওয়া তাদের ফ্ল্যাগশিপ ফোন ভিভো এক্স৭০ প্রো ছাড়া অন্য সব মডেলই দেশে তৈরি।

রিয়েলমির প্রজেক্ট ম্যানেজার নাবিল ইকবাল সমকালকে বলেন, তাদের সব ফোনই দেশে তৈরি হচ্ছে। বৈধভাবে অন্য দেশ থেকে রিয়েলমি ফোন আসার সুযোগ নেই। যদি এসে থাকে তবে তা অবৈধ পথে।

যেভাবে দেশে ঢুকছে ভারতীয় ফোন: সংশ্লিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে থাকার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত ভালো দাম পাওয়ায় দেশটির চোরাই ফোনের নিরাপদ গন্তব্য হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ থেকে চোরাই ফোন সংগ্রহ করেন রিসিভাররা (চোরাই ফোনের ক্রেতা তথা দালাল)। রিসিভারদের হাত ঘুরে ফোন চলে আসে কলকাতা, মুম্বাই ও গুজরাটের চক্রের সদস্যদের হাতে। বাংলাদেশের চোরাকারবারিরা হুন্ডি ও কুরিয়ারের মাধ্যমে দাম পরিশোধ করে তা দেশে আনেন।

জানা গেছে, ফোন চোরাচালানের রুট হিসেবে বেনাপোল, সিলেট ও আগারতলা সীমান্তকে বেশি ব্যবহার করে থাকে চোরাচালানি চক্রের সদস্যরা। গত কয়েক বছরে বিচ্ছিন্নভাবে চোরাই ফোনের কয়েকটি চালান আটক হলেও চোরাকারবারির এ চক্র রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে।

আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে কলকাতার পার্ক স্ট্রিট থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের ইরফানুর রহমান রুবেল এবং শেখ সেলিম নামে এক ভারতীয় ফোন চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ১৩১টি চোরাই ফোন উদ্ধার করা হয়। গত বছরের আগস্টে ভারত থেকে আসা চোরাই ফোনের একটি চালান আটক করে বাংলাদেশের গোয়েন্দা বাহিনী। এ চালানে প্রায় ৫০০টি হ্যান্ডসেট ছিল। এ ছাড়া চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের হাসিনা হক শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী আবদার উদ্দিনকে ভারতীয় চোরাই মোবাইল ফোনসহ গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা বাহিনী।

সূত্র জানিয়েছে, ভারত থেকে আসা চোরাই ফোনের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের অন্তত ৩০ সদস্যের একটি চক্র। চোরাকারবারির প্রত্যেকের নিজস্ব মোবাইল ফোনের ব্যবসা রয়েছে।

সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ভারতে চোরাই ফোনের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন এর মধ্যে রয়েছেন গুজরাটের কাশেম, মুম্বাইয়ের সিদেস, মাম্মু ও রহিস। এই চক্রে কলকাতাসহ আরও কয়েকটি প্রদেশের শীর্ষ কয়েকজন চোরাকারবারি যুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক মোবাইল ফোন চোরাচালান চক্রের সদস্য হাসম রহিস কোরাইশি ওরফে রহিস গত জুলাই মাসে দিল্লি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

দিল্লি পুলিশের বরাত দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ১৩ জুলাই ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই থেকে হাসম রহিস কোরাইশি (৩৩) নামে আন্তর্জাতিক মোবাইল ফোন চোরাচালান চক্রের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি মূলত বাংলাদেশে চোরাই ফোন পাচার করতেন। তবে বাংলাদেশ ছাড়াও থাইল্যান্ড ও সুদানেও তিনি ফোন পাচার করতেন।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দালালের মাধ্যমে চোরাই ফোন আগরতলা পাঠানো হয়। সেখান থেকে ফোনগুলো পাচার হয়ে বাংলাদেশে আসে। কোরাইশি এসব ফোন দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশের রিসিভার তথা দালালদের কাছ থেকে কিনতেন। দালালরা চোর ও ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে এসব ফোন কিনত। এর আগেও এই দালালচক্রের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছিল দিল্লি পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছেন, তারা ছিনতাইকারী, চোর ও অপরাধ কর্মের সঙ্গে যুক্ত চক্রের কাছ থেকে কিনতেন। এসব ফোন কোরাইশি দালালের মাধ্যমে আগরতলা পাঠাতেন। সেখান থেকে বাংলাদেশে পাচার হতো। ফোন বেচাকেনার টাকা হুন্ডি এবং কুরিয়ারের মাধ্যমে দেওয়া হতো।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদার সমকালকে বলেন, 'আমরা ফোনের ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই সচেতন করতে কাজ করছি। আশা করছি, অবৈধভাবে যারা দেশে হ্যান্ডসেট আনছে তারা সতর্ক হবে।'

এ সম্পর্কে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, 'দেশের বাজারে চোরাইসহ নানাভাবে আসা অবৈধ হ্যান্ডসেট রয়েছে, এটা অস্বীকারের উপায় নেই। ব্যবহারকারীরা যেন ফোন কেনার আগে বৈধ-অবৈধ যাচাই করেন এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে চাই।'

মন্ত্রী বলেন, 'বাজারে প্রকাশ্যে যদি অবৈধ হ্যান্ডসেট বিক্রি হয়, তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা রাজস্ব বোর্ডকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এটা তো চলমান অপরাধ। এগুলো বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজস্ব বোর্ডকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।'

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এডিসি এসএম আশরাফুল আলম সমকালকে বলেন, 'মোবাইল ফোন আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের সম্পর্কে তাদের হাতে কোনো তথ্য নেই। বাজারে যদি অবৈধ চোরাই ফোন পাওয়া যায় কিংবা এ রকম কিছু ঘটে থাকে তবে অবশ্যই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'