গুঞ্জন ছিল জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক তাদের নাম পরিবর্তন করতে চলেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত শুক্রবার ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ জানান, ফেসবুকের মালিকানাধীন যাবতীয় সেবাকে 'মেটা' নামে ছাতার নিচে আনা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ সেবা ফেসবুকের নাম অপরিবর্তিতই থাকছে। 'মেটা' হবে ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ সাইটের প্রধান কোম্পানি, যাকে কেন্দ্র করে আরও বেশকিছু নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠবে। সব মিলিয়ে একে বলা হচ্ছে, 'মেটাভার্স'। ২০১৪ সালে কিনে নেয় হোয়াটসঅ্যাপ। সবই 'ফেসবুক ইনকরপোরেশন'-এর অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল, যা এখন 'মেটা ইনকরপোরেশন'।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তায় দুর্বলতাসহ নানা কারণে সমালোচনায় পড়ে ফেসবুক। সেই সমালোচনা পেছনে ফেলে নতুন করে ব্র্যান্ডিংয়ের পেছনে এই নাম পরিবর্তন একটি বড় কারণ। ফেসবুক কানেক্ট নামের অনুষ্ঠানে তিনি তার 'মেটা' পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। কেমন হবে জাকারবার্গের 'মেটা' দুনিয়া? এবার মেটাভার্স স্ট্ক্রিনে পেজের পরিবর্তে ইন্টারনেটের ওপর ভিত্তি করে মেটা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চায়। নিল স্টিফেনসন ১৯৯২ সালে 'স্নো ক্র্যাশ' উপন্যাসে প্রথম মেটাভার্স শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

মেটা দুনিয়া

জাকারবার্গের ঘোষণার পর থেকেই সবার মনে মেটাভার্স কী, এটি কীভাবে কাজ করবে, এর উপযোগিতা কী এসব নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। এটি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) ও অন্যান্য প্রযুক্তির সাহায্যে চলবে। প্ল্যাটফর্মটির প্রতিষ্ঠাতা জাকারবার্গের ভাষায়, এটি এমন এক 'ভার্চুয়াল পরিবেশ' যার মধ্যে আপনি প্রবেশ করতে পারবেন। প্রকৃতপক্ষে মেটাভার্স হলো এক সীমাহীন জগৎ। যেখানে পরস্পর সংযুক্ত ভার্চুয়াল সমাজ থাকবে, যেখানে মানুষ পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করবে, কাজ করবে, খেলবে। এসব করবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) হেডসেট, অগমেন্টেড রিয়েলিটি চশমা, স্মার্টফোন অ্যাপ ও অন্যান্য ডিভাইসের মাধ্যমে। কম্পিউটারের সামনে বসে না থেকে ভিআর হেডসেট লাগিয়েই আপনার প্রিয় ওয়েবসাইটগুলোতে ঢুঁ মারতে পারবেন।

কী করা যাবে মেটা দুনিয়ায়

মেটাভার্স এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, এর মাধ্যমে আপনি বন্ধু-প্রিয়জনসহ অন্যদের আপনার সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম হবেন। যেমন- ভার্চুয়াল কনসার্টে যাওয়া, অনলাইনে ঘুরতে যাওয়া, শিল্পকর্ম দেখা বা সৃষ্টি করা কিংবা কেনাসহ অনেক কিছুই করা সম্ভব হবে এই মেটাভার্সের দুনিয়ায়। বাড়িতে বসে কাজ করার ক্ষেত্রেও আসবে বহুমাত্রিক পরিবর্তন। সংকটময় মুহূর্তে সহকর্মীদের সঙ্গে ভিডিও কলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর পাশাপাশি ভার্চুয়ালি অফিসেও যোগদান করতে পরবেন। অদূর ভবিষ্যতে এর দ্বারা অনলাইনে কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারসহ অনলাইন জগতের নানা কাজ সহজে করা যাবে।

কোম্পানিগুলোর জন্য হরাইজন 'ওয়ার্করুমস' নামক সফটওয়্যার চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যা ব্যবহার করা যাবে ফেসবুকের অকুলাস ভিআর হেডসেট দিয়ে। এটির মূল্য ৩০০ ডলারের অধিক হওয়ায় মেটাভার্সকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। ফলে মেটাভার্স অনেকেরই নাগালের বাইরে চলে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

তবে বিভিন্ন কোম্পানির অ্যাভাটার ব্যবহার করে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ভ্রমণ করতে পারবেন। ইতোমধ্যে কোম্পানিটি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটিতে (এআর) বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। প্রায় তিন বিলিয়ন ব্যবহারকারীকে বিভিন্ন ডিভাইস এবং অ্যাপসের মাধ্যমে সংযুক্ত করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

গত ২৮ অক্টোবর নিজের অফিসিয়াল পেজ থেকে 'ফাউন্ডার্স লেটার ২০২১' শিরোনামে 'মেটাভার্স' সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন মার্ক জাকারবার্গ। তিনি বলেন, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার পরিধি কিছু নির্দিষ্ট ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যখন ফেসবুক শুরু হয়, তখন টেক্সট-নির্ভর ব্যবহার ছিল। ক্যামেরা ফোন আসার পর ব্যবহারের ধরন বদলে গেল। এখন ভিডিওর মাধ্যমে আরও সহজে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা যায়। আগামীতে এটি আরও বদলে যাবে, যেখানে শুধু দেখা বা শোনা নয়, অন্যের অস্তিত্ব অনুভবও করা যাবে। হলোগ্রামের মতো হয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়া যাবে ঘরে বসেই। এটিই সোশ্যাল টেকনোলজির স্বপ্ন।

সম্ভাবনা ও আশঙ্কা

জাকারবার্গের মতে, ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ অনেক আশা জাগায়। এই দুনিয়ার ভবিষ্যৎ ব্যাপক সম্ভাবনাময়। ভবিষ্যতে ইন্টারনেটই ডিজিটাল অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হবে। তাই আগামীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে নয়, ফেসবুককে মেটাভার্স প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখতে শুরু করবে মানুষ। অনেক সুবিধার পাশাপাশি মেটাভার্স কিছু বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। এটা আমাদের তথ্য হাতানোর আরেকটা মাধ্যম হবে- এমন আশঙ্কাও করছেন অনেকে। তাদের ধারণা, মেটাভার্সের মাধ্যমে ফেসবুক আমাদের আরও বেশি তথ্য হাতিয়ে নেবে। যেহেতু বিজ্ঞাপনই তাদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েই থাকবে, তাই এই আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার নয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এসব তথ্যের অপব্যবহার ঠেকানো কঠিন হবে।