করোনার ধাক্কায় এলোমেলো হয়ে যাওয়া ঘরোয়া ফুটবলে আলোক রেখা দেখা যায় ২০২১ সালে। ঘরোয়া প্রতিযোগিতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যস্ত সময় পার করে বাংলাদেশ। বছর শেষে সাধারণত পুরুষ ফুটবল দলের পারফরম্যান্সেরই মূল্যায়ন করা হয়। বিশ্লেষণ করা হয় তাদের সফলতা ও ব্যর্থতার। তবে ২০২১ সালের আলোচনায় নেই বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দল। গত এক বছরে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশ নিলেও নেই কোন সফলতা।

মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত সাফ ফুটবলে শ্রীলংকার বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় ছাড়া আর কোন সফলতা দেখাতে পারেনি বেঙ্গল টাইগাররা। নেপালে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় আসরেও জ্বলে উঠেতে পারেনি জামাল ভুঁইয়ার দল। সর্বশেষ শ্রীলংকায় চার জাতির প্রাইম মিনিস্টার কাপে অংশগ্রহণ করতে গিয়েও ঘুরেছে ব্যর্থতার আবর্তে।

পুরুষ দল বড় কোন ট্রফি জয়ে ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশের ফুটবল অনুরাগীদের আনন্দে ভাসিয়েছে নারী ফুটবল দল। সাফ অনূর্ধ -১৯ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এশিয়ার অন্যতম ফুটবল পরাশক্তি ভারতের অনূর্ধ-১৯ নারী ফুটবল দলকে ১-০ গোলে হারিয়ে অপরাজিত দল হিসেবে শিরোপা অক্ষুন্ন রেখেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ-১৯ নারী ফুটবল দল।

এই জয় দিয়ে মারিয়া মান্ডার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল যে শুধু দেশের মান বাঁচিয়েছে তাই নয়, বিজয়ের মাসে শিরোপা জয়ের মাধ্যমে স্বীধনতার ৫০ বছর পুর্তি উদযাপনের মুহুর্তকে দেশের ফুটবল অনুরাগীদের স্মরণীয় করে রাখার একটি মুহুর্তও উপহার দিয়েছে।

এর বাইরেও নারী ফুটবল দল ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনকে দারুণ ভাবে মাতিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের নারীরা ফুটবল খেলবে, সেটি ভাবতেই অবাক লাগতো। তবে মানুষের সেই মনোভাব ভেঙ্গে দিয়ে দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মান বইয়ে আনতে শুরু করেছে নারী ফুটবল দল। যা সত্যিই গর্ব করার মত। এ জন্য বিশেষ একটি ধন্যবাদ পেতেই পারে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল।

প্রায় দেড় যুগ ধরে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দলের সফলতা যেখানে শুন্যের কোটায় নেমে এসেছে, সেখানে নারীরা বিভিন্ন আসরে একের পর এক শিরোপা জয়ের মাধ্যমে দেশের সম্মানকে সমুজ্জল রেখে চলেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে নারী ফুটবলের উন্নতি চোখের পড়ার মত।

পুরুষ ফুটবল দল যেখানে শিরোপা জয়ের জন্য সংগ্রাম করছে, সেখানে মহিলা ফুটবল দলের কাছ থেকে কিছুই আশা করার ছিল না। তবে অসাধ্য সাধন করে সাফ ট্রফি জিতে নিয়েছে মারিয়া মান্ডার দল।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের  রাউন্ড রবিন লীগ পর্বে বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ম্যাচে হিমালয় কন্যা নেপালের সঙ্গে গোলশুন্য ড্র করে পয়েন্ট ভাগাভাগি করলেও আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। এরপর ভুটানকে ৬-০ গোলে, ভারতকে ১-০ গোলে এবং লীগ পর্বের শেষ ম্যাচে শ্রীলংকাকে ১২-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হিসেবে ফাইনালে জায়গা করে নেয়।

ফাইনালে আগ্রাসী মেজাজে খেলে সফরকারী ভারতীয়দের নাস্তানাবুদ করতে থাকে বাংলাদেশের কিশোরীরা। এই সময় বেশ কয়েকটি গোলের সুযোগও হাতছাড়া করে স্বাগতিক দল। ম্যাচ দেখার জন্য বিপুল সংখ্যক দর্শক হাজির হয় কমলাপুরস্থ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে। শেষ পর্যন্ত তাদের হতাশ হতে হয়নি। ম্যাচের ৮১ মিনিটে স্বাগতিকদের হয়ে জয়সুচক গোলটি করেছে আনাই মোগিনি। ডি বক্সের ভেতর সতীর্থের কাছ থেকে পাওয়া ব্যাক পাসের বল তিনি গোলবক্স লক্ষ্য করে ক্রস করলে পরাস্ত হন সফরকারী ভারতের গোল রক্ষক আনসিকা। বলটি সরাসরি আশ্রয় নেয় জালে।

পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ ২০ গোল করলেও হজম করেনি একটিও গোল। ফলে অপরাজিত দল হিসেবে শিরোপা অক্ষুন্ন রাখে কোচ গোলাম রব্বানি ছোটনের শিষ্যরা। এজন্য প্রধান কোচ হিসেবে বাড়তি ধন্যবাদ পেতেই পারেন তিনি। কারণ দক্ষিণ এশীয় নারী ফুটবলে এটি একটি অনন্য রেকর্ড।

এর আগে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত  পুরুষদের সাফ চ্যাম্পিয়নশীপ টুর্নামেন্ট শুরুর  মুহুর্তে ইংলিশ কোচ জেমি ডের পরিবর্তিত হিসেবে অন্তবর্তীকালিন কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় বসুন্ধরা কিংসের প্রধান কোচ অস্কার ব্রুজেনকে।  তবে তাদের ওই পরকিল্পনা খুব একটা কাজে আসেনি। দেড় যুগের শিরোপা খরা দূর করতে পারেনি দল। ফের খালি হাতে দেশে ফিরে আসে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল।

এরপর নেপালের ত্রিদেশীয় এবং শ্রীলংকার চার জাতির আসরে অংশ নিলেও সফলতা পায়নি। অবশ্য চার জাতির আসরে বাংলাদেশ দলের সফলতা বলতে একটি। সেটি হচ্ছে মালদ্বীপের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়। ২০০৩ সালের পর এই প্রথম দ্বীপদেশটির বিপক্ষে এমন জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।

এদিকে ঘরোয়া ফুটবলে বলতে গেলে প্রায় সবগুলো বড় আসরের শিরোপা ঘরে তুলেছে বসুন্ধরা কিংস।  ফেডারেশন কাপের শিরোপা জয়ের মাধ্যমে মৌসুম শুরু করে তারা। ফাইনালে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবকে ১-০ গোলে হারায় বসুন্ধরা। একমাত্র ক্লাব হিসেবে তারা অভিষেকে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) শিরোপা জয় করেছে। দলটির যে সামর্থ্য তাতে এবারও লীগ শিরোপা ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখতে পারে তারা। এতে টানা দ্বিতীয় লীগ শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব পাবে দলটি।

অবশ্য দেশের হয়ে এএফসি কাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল বসুন্ধরা। তবে পরের রাউন্ডেই যেতে পারেনি তারা। ঘরোয়া ফুটবলে ধারাবাহিক পারফর্মেন্সে থাকা দলটি অবশ্য স্বাধীনতা কাপের ফাইনালে ০-৩ গোলে হেরে গেছে ঢাকা আবাহনী লিমিটেডের কাছে।