সামাজিক নেটওয়ার্কিং ছিল আজ থেকে ৫০ হাজার বছর আগেও। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবসময় এক জিনিসের উপর নির্ভরশীল ছিল না। বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় এমন একটি অনন্য বস্তু শনাক্ত করেছেন যা প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। তা হলো উটপাখির ডিমের খোসার পুঁতি। এটি এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা প্রাচীনতম সামাজিক নেটওয়ার্ক।

আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাংশের মানুষেরও ছিল নিজস্ব ‘ফেসবুক রিয়্যাকশনস’। একটাই পার্থক্য, বর্তমানের ফেসবুক রিয়্যাকশনের মতো সেগুলো ভার্চ্যুয়াল ছিল না, কারণ সেগুলো তৈরি ছিল উটপাখির ডিমের খোসা দিয়ে। আরও ভালো করে বলতে গেলে, অস্ট্রিচ থুড়ি উটপাখির ডিমের খোসা দিয়ে তৈরি পুঁতি দিয়ে। 

সম্প্রতি নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জানা গেছে এই তথ্য। গবেষকদের ধারণা, প্রথমে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাংশে এই পুঁতির অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও মূলত পূর্বদিকের প্রদেশগুলো থেকেই এই পুঁতি ব্যবহারের সূচনা। 

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে বিলুপ্ত হয় পুঁতি

গবেষকরা বলছেন, মূলত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে এই পুঁতি ব্যবহার করা হতো। আরও বিস্তারিতভাবে বললে, এগুলো ছিল বন্ধুত্বের চাবিকাঠি। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় থেকে দূর-দূরান্তের বন্ধু, সকলের সঙ্গেই এই পুঁতির আদানপ্রদান করা হতো। যার কাছে যত বেশি পুঁতি, তার সামাজিক জীবন ততই রঙচঙে— এমনটাই সম্ভবত ভাবতেন তৎকালীন মানুষেরা। আর এখানেই খানিকটা মিল পাওয়া যায় বর্তমান যুগের সমাজমাধ্যমের সঙ্গে। 

গবেষণায় জানা গেছে, কেউ হয়তো নিজের কাছাকাছি কাউকে ওই বিশেষ পুঁতি দিল। সে হয়তো শিকার করতে গিয়ে সেই পুঁতিটা খানিক দূরে বসবাসকারী কাউকে দিল— এভাবেই বিভিন্ন স্থানের মানুষের মধ্যে তৈরি হতো এক সামাজিক নেটওয়ার্ক। আজ থেকে প্রায় ৩৩ হাজার বছর আগে এই বিনিময় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ধীরে-ধীরে ভেঙে পড়ে এই সামাজিক ‘নেটওয়ার্ক’টি।

পুঁতি ব্যবহার করে তিন হাজার কিমি পর্যন্ত সামাজিক নেটওয়ার্ক 

অতীতে কখন, কীভাবে বিভিন্ন মানুষ সংযোগ স্থাপন করেছিলেন তা নিয়ে গবেষকরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা গবেষণার দেখেছেন- ৫০ হাজার বছর আগে পূর্ব এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষরা প্রায় অভিন্ন উটপাখির ডিমের খোসার পুঁতি ব্যবহার করে যোগাযোগ স্থাপন করতেন। এর মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বে সামাজিক নেটওয়ার্ক স্থাপন হয়েছিল। এই নেটওয়ার্ক দুটি ভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে সংযুক্ত করেছিল।

সামাজিক সম্পর্ক বোঝার আদর্শ নিদর্শন

গবেষকরা জানান, গবেষণালব্ধ ফলাফলটি নিয়ে আমরা পরীক্ষা করেছি। তাতে পুঁতির বৈশিষ্ট্যগুলো একই প্রমাণ দিচ্ছে যে তা ছিল ৫০ হাজার বছর আগেকার। ৩৩ হাজার বছর আগে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গবেষকদের মতে, উটপাখির ডিমের খোসার পুঁতি প্রাচীন সামাজিক সম্পর্ক বোঝার জন্য আদর্শ নিদর্শন। এগুলো হলো বিশ্বের প্রাচীনতম অলঙ্কার যা পুঁতি থেকে তৈরি হয়।

পুঁতি ব্যবহার করে তিন হাজার কিমি পর্যন্ত সামাজিক নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছিল

১৫০০টিরও বেশি পৃথক পুঁতি থেকে পাওয়া তথ্য গবেষণায়

গবেষণার প্রধান লেখক জেনিফার এম মিলার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এটি ব্রেডক্রাম্বের একটি পথ অনুসরণ করার মতো। পুঁতিগুলো সূত্র, সময় এবং স্থানজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, শুধু লক্ষ্য করার অপেক্ষায।’ উটপাখির ডিমের খোসার জপমালা যার মধ্যে রয়েছে ১৫০০টিরও বেশি পৃথক পুঁতির তথ্য, যা দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকার ৩১টি সাইট থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে। বিগত ৫০ হাজার বছর ধরে তা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটকে জুড়ে রেখেছে।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে বিলুপ্ত হয় পুঁতি

নতুন সংযোগটি এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা প্রাচীনতম সামাজিক নেটওয়ার্ক। এটি পূর্ব আফ্রিকার একটি বিশেষ সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। পুঁতিগুলো আশ্চর্যজনকভাবে ৩৩ হাজার বছর আগে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর একটি বড় পরিবর্তনের জন্য অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। পূর্ব আফ্রিকায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইন বেল্ট দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়ায় বৃষ্টিপাতের একটি নাটকীয় হ্রাস হয়েছিল, তার জেরেই বিলুপ্ত ওই পুঁতি।

সাংস্কৃতিক সংযোগ অন্বেষণে উৎসাহিত করবে পুঁতিগুলো 

গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, ‘প্যালিওএনভায়রনমেন্টাল প্রক্সি, জলবায়ু মডেল এবং প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের এই সমন্বয়ের মাধ্যমে, আমরা জলবায়ু পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক আচরণের মধ্যে সংযোগ দেখতে পারি। এই ক্ষুদ্র পুঁতিগুলো আমাদের অতীত সম্পর্কে বড় গল্প প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে। আমরা অন্যান্য গবেষকদের এই ডাটাবেস তৈরি করতে এবং নতুন অঞ্চলে সাংস্কৃতিক সংযোগের প্রমাণ অন্বেষণ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করি।



বিষয় : সামাজিক নেটওয়ার্কিং উটপাখির ডিমের খোসার পুঁতি ফেসবুক রিয়্যাকশনস

মন্তব্য করুন