পায়ের সমস্যার জন্য নানাজনের নানা কথা শুনতে হয়েছে অনিক মাহমুদকে। বিষাদমাখা অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সমাজের স্বাভাবিক গতিপথ থেকে  অনেকটা ছিটকে পড়া একজন মানুষ ছিলাম আমি। কিন্তু ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ শুরুর পর আমি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করি। নিজেকে নিয়ে যে হীনমন্যতা ছিল তা আমার কেটে যেতে থাকে। পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে না পারার কষ্ট আমার কাছে নগণ্য হয়ে ওঠে। আমার নিজের মধ্যে তখন বিশ্বাস জন্মে, ইচ্ছেশক্তি থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়। আমি ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে কাজ করে সম্মান পাচ্ছি, মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমি সত্যিকারে মানুষ হয়ে উঠেছি।

তিনি বলেন, গ্রামের অসংখ্য তরুণ-তরুণী বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ পড়াশোনা করে চাকরি খুঁজছে, কেউ পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু করার চেষ্টা করছে। আমি বলব, উদ্যোমী তরুণ-তরুণীদের জন্য ফ্রিল্যান্সা মার্কেটপ্লেস হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা। এখানে প্রচুর কাজ আছে। আপনাকে শুধু একটু দক্ষ হয়ে উঠতে হবে, কমিটমেন্ট রাখতে হবে। আর সেটা হলে আপনাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। আমি ইতোমধ্যে অনলাইনে সাত শতাধিক তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন মার্কেটপ্লেস থেকে আয় করছেন।

ফ্রিল্যান্সার হয়ে ওঠার পেছনে মাগুরার সফল ফ্রিল্যান্সার ফাহিমুল করিম তার অনুপ্রেরণা বলে উল্লেখ করেন অনিক। ফাহিমের একটি ভিডিও অনিককে দিয়েছে নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস। (মাগুরার সফল ফিদ্ধল্যান্সার ফাহিমুল করিম ডুচেনেমাসকিউলার ডিসথ্রফি নামে জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অল্প বয়সেই তার শরীরের পেশি শুকিয়ে পুরো শরীর অচল হয়ে যায়। সচল ছিল শুধু মাথা ও ডান হাতের দুটি আঙুল। এরপরও বিছনাবন্দি ফাহিম ওঠেন সফল ফ্রিল্যান্সার। ফাহিমকে নিয়ে বিশেষ ভিডিও করে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্ক। ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর দুরারোগ্য এ ব্যধিতেই ২২ বছর বয়সেই মারা যান ফাহিম)। পাশাপাশি বাবার কথাও স্মরণ করেন তিনি। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কম্পিউটার না কিনলে আজ হয়তো ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুন্দর জগত দেখা হতো না তার। ফাহিমের মতো তার বাবাও একই বছর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। প্রিয় বাবার মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন তিনি। দুই মাস ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন শোকাহত অনিক। তবে সবার উৎসাহে ফিরে ফ্রিল্যান্সিংয়ের দুনিয়ায়। তিনি এখন তার মতো কিংবা তার আদর্শ ফাহিমের মতো অসহায় শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু করতে চান।

২০১৩ সালে অনিকের এক খালাতো বোন গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে এসএসসি পাস করে। দোকানদারি করতে গিয়ে পড়াশোনা বন্ধ হলেও খালাতো বোনের ওই ফলাফল অনিককে দারুণভাবে নাড়া দেয়। তিনি ভাবতে থাকেন, পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পারলে অত ভালো না হোক পাস তো করতে পারতেন। ভেতরে এক ধরনের জেদ জেগে ওঠে। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে বাবাকে রাজি করান। দোকানের পাশাপাশি মাত্র তিন মাসের পড়াশোনায় এসএসসিতে ভালোভাবে উতরে যান তিনি। এ সময়ের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে অনিক বলেন, এমনও হয়েছে, আমি দোকান থেকে সরাসরি পরীক্ষার হলে গিয়েছি, আবার পরীক্ষা শেষে ফিরে এসে দোকানে বসেছি। তবে উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তি হলেও শেষ করতে পারেননি। এক এক বিষয়ের ক্লাস এক এক রুমে হওয়ার ফলে এবং কলেজের ভবন প্রতিবন্ধীবান্ধব না হওয়ায় ক্লাস করা হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ছিল দোকানে বসার চাপ। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনাটা আর চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি।

ঘুরতে পছন্দ করেন অনিক। নতুন নতুন জায়গা আর নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে ভালোবাসেন। তবে শারীরিক সমস্যার কারণে দ্বারে-দ্বারে ঘুরতে যাওয়া হয় না তার। প্রথমবারের মতো কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়েছিলেন তিনি। বিদেশ ভ্রমণের ইচ্ছেও রয়েছে তার। তার আরও একটি স্বপ্ন হচ্ছে নিজের একটি গাড়ি যেটি তিনি নিজেই চালাতে চান। তিনি ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন, পায়ে শক্তি না থাকলেও নিজের পায়ে ভর করে দাঁড়ানো যায়। এ জন্য দরকার মনের শক্তি ও সাহস। তিনি বিশ্বাস করেন, যা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছেশক্তির কাছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বাধা নয়। এই সাহসে ভর করেই প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ, পরিবশে ও দুনিয়া দেখতে চান তিনি, যেখানে কেউ কাউকে ছোট করে দেখবে না, সবার পরিচয় হবে মানুষ।