কুষ্টিয়া শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে পোড়াদহ বাজার। তাঁতের কাপড়ের জন্য এমনিতেই বিখ্যাত কুষ্টিয়ার এ বাজার। বাজারে ছোট্ট একটি অফিসে বসে তাঁতের কাপড় বোনার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের এক গ্রাহকের পছন্দের টি-শার্ট ডিজাইন করছেন অনিক মাহমুদ। বিশেষভাবে সক্ষম (অনিক নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারেন না, চলাফেরা করেন হুইলচেয়ারে) অনিক মাহমুদ এখন বিশ্বসেরা ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্কে একজন টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার এবং ফাইবারে লেভেল ২ সেলার। পাশাপাশি বিভিন্ন মাইক্রোস্টোক সাইট এবং পড সাইটেও কাজ করছেন তিনি। আন্তর্জাতিক এসব মার্কেটপ্লেসে শুধু টি-শার্ট ডিজাইন করেই মাসে আয় করছেন দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। কাজের পরিধি বাড়ায় উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন অনিক। 'প্রফেসর আইটি জোন' নামে অফিস খুলে ১০ জনের ছোট্ট একটি টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। অনিকের টিমে এখন কাজ করছেন আলিফ, টিপু, জুন্নুন, জীবন, আঁখি, অঞ্জনা, আবীর, রিফাত, মান্না ও উশমির মতো তরুণরা। পড়াশোনার পাশাপাশি তারাও হয়ে উঠছেন সফল ফ্রিল্যান্সার। সম্প্রতি বেসিসের বর্ষসেরা ফ্রিল্যান্সার খেতাব জিতেছেন। 'বিশেষভাবে সক্ষম' ক্যাটাগরিতে এককভাবে পুরস্কারটি জিতেছেন তিনি।

অনিকের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর গল্প

প্রাণখোলা হাস্যোজ্জ্বল তরুণ অনিক মাহমুদ। চেয়ারে বসে থাকলে বোঝার উপায় নেই, এই তরুণের দুটি পা জন্মগতভাবেই ত্রুটিপূর্ণ। যার কারণে পায়ে ভর দিয়ে হাঁটাচলা করতে পারেন না। পায়ের বদলে হুইলচেয়ারসর্বস্ব জীবন তার। আজকের সফল ফ্রিল্যান্সার অনিকের গল্প এতটা সহজ নয়। হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা অনিক তো একসময় মাধ্যমিকের গণ্ডিই পেরোতে পারেননি। অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনার পাট চুকিয়ে হয়ে গেলেন দোকানি। একজন দোকানদার থেকে কীভাবে হয়ে উঠলেন সফল ফ্রিল্যান্সার কিংবা পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে না পারা অনিক কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়ালেন- এমন প্রশ্নে এই প্রতিবেদকের কাছে জীবনের গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন তিনি। অনিক যেন ফিরে যান ঠিক এক দশক আগে ২০১২ সালে। তার বাবা মোজাহের আলী এমপিওভুক্ত হালসা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। মা শিরিন আক্তার গৃহিণী। ওই সময় তার বড় ভাই আবীর মাহমুদ ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হলেন। ভাইয়ের সেমিস্টার ফি, ঢাকায় থাকা-খাওয়া, পড়াশোনা বাবদ বাবার আয়ের বড় অংশই ব্যয় হতে লাগল। এক ধাপে বাবার একক আয়ের সংসারে খানিকটা টানাপোড়েন শুরু। হুইলচেয়ারে করে বন্ধু-স্বজনের সহযোগিতায় স্কুলে আসা-যাওয়া করেন তিনি। তিনি বলেন, পড়াশোনায় একেবারে খারাপ ছিলাম তা নয়, কিন্তু অস্বাভাবিক ছন্দহীন জীবন। কিছু একটা করতে হবে, স্বাবলম্বী হতে হবে- এমন ভাবনা থেকে আমি বাজারে দোকান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। বাবাও সায় দেন।

পোড়াদহ বাজারে ঢুকলেই দেখা মিলবে অনিকের 'অনিক বুক ফেয়ার অ্যান্ড কম্পিউটার্স' দোকানটি। তবে দোকানটিতে এখন আর বসেন না তিনি। দোকানটি চালাচ্ছেন সোহান আলী নামের একটি ছেলে। অদূরেই 'প্রফেসর আইটি জোন'-এর ছোটখাটো অফিস। এখানেই বসে বসে ডিজাইনিংয়ের কাজ করছেন কয়েকজন তরুণ-তরুণীরা। তাদের কাজ তদারক করছেন অনিক মাহমুদ।

২০১২ সালে এলাকার একটি কম্পিউটার সেন্টার থেকে মাইক্রোসফট অফিস বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। টুকটাক কাজ শেখেন। ওই সময় কৃষি ব্যাংক থেকে ৪০ হাজার টাকা লোন করে বাবা তাকে কম্পিউটার কিনে দেন। ওই কম্পিউটারটা নিয়ে দোকান শুরু করেন তিনি। দোকানে বসে কম্পিউটারে কম্পোজ, ছবি থেকে ছবি, ই-মেইলের মতো কাজ শুরু করেন। দোকানের যৎসামান্য আয়ে খুব ভালোভাবে চলা সম্ভব নয়। তিনি ভাবতে থাকেন নতুন কিছু, বাড়তি কিছু করা যায় কিনা। ওই সময়ে ইন্টারনেটে নানা বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখতেন। তিনি দেখলেন, ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করা যায়। যেহেতু হাঁটাচলায় সমস্যা, ঘরে বসে যদি ভালো অর্থ আয় করতে পারা যায়, সেটা তো মন্দ হয় না। এ চিন্তা থেকেই ২০১৮ সালে ই-শিখন নামের ইন্টারনেটনির্ভর পড়াশোনার প্ল্যাটফর্ম থেকে অনলাইনে গ্রাফিক ডিজাইনে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেন। এখান থেকে গ্রাফিক ডিজাইনের বিস্তারিত ছাড়াও মার্কেটপ্লেস সম্পর্কে ভালো ধারণা, কাজ পাওয়ার উপায়, অর্থ উত্তোলন প্রক্রিয়া এসব বিষয় শেখেন। এসব বিষয়ে ইউটিউবে প্রচুর ভিডিও আছে, দক্ষতা অর্জনে এসব ভিডিওর সহযোগিতা নেন।

টি-শার্ট ডিজাইনে দিনবদল

অনিক শুরুতে মার্কেটপ্লেসে বিজনেস কার্ড কিংবা লোগো ডিজাইন নিয়ে কাজ করতেন। কম্পিউটারের দোকানে এ ধরনের কাজ করে আগেই হাত পাকিয়েছেন তিনি। ফলে মার্কেটপ্লেসে কাজটা শুরু থেকেই ভালোভাবে করতে পারতেন। কিন্তু মার্কেটপ্লেসে কার্ড ডিজাইন কিংবা লোগো ডিজাইনের কাজ অপেক্ষাকৃত কম। কেননা একটা কোম্পানি কিংবা কেউ ব্যক্তিগতভাবে একবারই কার্ড ডিজাইন করবে, লোগোও একই রকম। কিন্তু টি-শার্টের ব্যাপারটা ভিন্ন। তিনি বলেন, আমরা যেসব দেশের ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করি, তারা একই ডিজাইনের টি-শার্ট খুব বেশিদিন পরেন না। কোথাও ঘুরতে যাবেন, তাদের চাই নতুন টি-শার্ট; কোনো প্রোগ্রামে যাবেন, চাই নতুন টি-শার্ট। প্রোগ্রাম কিংবা ভ্রমণের সঙ্গে যায় চট করে এ রকম ডিজাইনের টি-শার্ট বানিয়ে নেন তারা। তো দেখা যায়, মার্কেটপ্লেসে টি-শার্ট ডিজাইনের প্রচুর কাজ রয়েছে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের এক গ্রাহকের জন্য একটা টি-শার্ট ডিজাইন করি। সম্ভবত হ্যালোউইন পার্টির জন্য। তিনি ডিজাইনটি প্রিন্ট করে টি-শার্ট বানিয়ে সেটি গায়ে পরে একটি শর্ট ভিডিও করেন। ওই ভিডিও তিনি আবার আমাকেও পাঠান। কাজটি ছিল ২০ ডলারের। তিনি খুশি হয়ে আরও ১৫ ডলার যোগ করে ৩৫ ডলার দেন। বিষয়টি আমাকে দারুণভাবে আন্দোলিত করে, আমি দারুণ রোমাঞ্চিত হই এটি ভেবে যে, বিশ্বের প্রথম শ্রেণির একটি দেশের একজন তরুণ আমার ডিজাইন করা টি-শার্ট পরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, রাস্তায় ঘুরছেন, সেটি আবার ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছাড়ছেন। এই ভিডিও দেখার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই, শুধু টি-শার্ট ডিজাইনের কাজই করব। এটি আমাকে যেমন আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য দিচ্ছে, তেমনি আনন্দও দিচ্ছে। ২০১৯ সালের শেষের দিকে আপওয়ার্কে প্রায় পাঁচ হাজার ডলারের টি-শার্ট ডিজাইনের কাজ পান তিনি। এটিই তার কোনো মার্কেটপ্লেসে বড়সড় কাজ। ওই কাজ সফলভাবে করার জন্য কয়েকজনকে নিয়ে টিম গঠন করেন যারা, তারা আমার কাছেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে কাজ করার পাশাপাশি অনলাইনে ও সশরীর উপস্থিতিতে গ্রাফিক ডিজাইন বিশেষ করে টি-শার্ট ডিজাইনের ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি। অনলাইনে চার মাসব্যাপী ৫০ ঘণ্টার একটি কোর্স করাচ্ছেন তিনি। বলা যায়, টি-শার্ট ডিজাইনই তার নেশা ও পেশা। নিজেই এখন একটা ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম বানাতে চান। তবে মার্কেটপ্লেসে কাজ করতে হলে ইংরেজি জানার বিকল্প নেই, খুব বেশি পড়াশোনা না করেও বিষয়টি কীভাবে রপ্ত করলেন তিনি- এমন প্রশ্নের জবাবে অনিক বলেন, আমি ইংরেজিতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে হিন্দি সিনেমার ইংরেজি সাবটাইটেল খুব খেয়াল করে দেখতাম। প্রতিদিন ডিকশনারি থেকে পাঁচটি করে নতুন শব্দ শিখতাম। এ ছাড়া গুগল ট্রান্সলেটর তো রয়েছেই। চেষ্টা করলে আসলে কোনো কিছুই আটকে থাকে না, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন অনিক।