ন্যাশনাল জিওগ্রাফি বিশ্বের আলোচিত ও অনুপ্রেরণাদায়ী ২৫ নারী বিজ্ঞানী ও এক্সপ্লোরারের জীবনকর্ম নিয়ে প্রকাশ করে 'নো বাউন্ডারিজ' শিরোনামের বিশেষ সংখ্যা। এতে উঠে এসেছে এভারেস্টজয়ী বাংলাদেশের দ্বিতীয় নারী পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজরীনের জীবনকর্ম। ২০১২ সালের ২৬ মে এভারেস্ট জয় ছাড়াও তিনি সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গও জয় করেন। ২০১৬ সালে ওয়াসফিয়া ন্যাশনাল জিওগ্রাফির সেরা উদীয়মান অভিযাত্রী হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২৫ নারী বিজ্ঞানী ও এক্সপ্লোরার
ন্যাশনাল জিওগ্রাফি প্রকাশিত নো বাউন্ডারিজ বইটি ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে পাওয়া যাচ্ছে অ্যামাজনে। এর আগে নেওয়া হয়েছিল প্রি-অর্ডার। বইটি লিখেছেন এবং কিউরেট করেছেন গ্যাবি সালাজার এবং ক্লেয়ার ফাইসেলার। আর ২৫ জনকে তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।

ওয়াসফিয়ার পথচলা
'বাংলাদেশ অন সেভেন সামিট' প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসফিয়া নাজরীন পৃথিবীর সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ বিজয়ী প্রথম বাংলাদেশি। ২০১১ সালের ২ অক্টোবর আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পবর্তশৃঙ্গ কিলিমানজারোয় আরোহণের মধ্য দিয়ে শুরু করেন এবং ২০১৫ সালের ১৮ নভেম্বর ওশেনিয়া অঞ্চলের কারস্তেনস পিরামিড জয়ের মধ্য দিয়ে এ অভিযান সম্পন্ন করেন। তিনি ২০১২ সালের ২৬ মে সর্বোচ্চ পবর্তশৃঙ্গ এভারেস্টে বাংলাদেশের কনিষ্ঠতম ও দ্বিতীয় নারী হিসেবে পা রাখেন। পর্বতারোহণ ছাড়াও তিনি সমাজকর্ম ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। পর্বতারোহণে পূর্ণকালীন হওয়ার আগে কর্মজীবনে তিনি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় যুক্ত ছিলেন। তিব্বতে তিনি বেশ কিছুদিন মানবাধিকার নিয়েও কাজ করেছেন। ওয়াসফিয়ার জন্ম ১৯৮২ সালে ঢাকায়। তিনি স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকায় পড়াশোনা করেছেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার এগনেস স্কট বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক মনোবিজ্ঞান ও স্টুডিও আর্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেন। স্কটল্যান্ডেও তিনি কিছুদিন পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনে তিনি যুদ্ধবিরোধী ও মানবতাবিষয়ক ইস্যুতে ছিলেন সক্রিয়।

পর্বতারোহণের পরিশ্রম
পর্বতারোহণ অভিযানে কী ধরনের পরিশ্রম করতে হয়- কেবল মানসিক প্রত্যয়ই নয়; প্রয়োজন শারীরিক সহ্যক্ষমতাও। ওয়াসফিয়া সমকালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'পর্বতারোহণ অভিযানের সাফল্যটা সবাই জানে। তবে প্রতিটি অভিযানে যাওয়ার আগেও অনেক ঝামেলা থাকে। যেমন- দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আকনকাগুয়া যেতে হলে আর্জেন্টিনার ভিসা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার দূতাবাস নেই! ভারতে যেতে হবে। ওই ভিসা পেতে দুই মাস ভারতে গিয়ে পড়ে থাকতে হয়েছিল। আবার প্রত্যেক পর্বতারোহণের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। ওই সময় শেষ হয়ে গেলে ভিসা পেয়েও লাভ নেই। এ ছাড়া অভিযানের জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ। মিডিয়ায় শুধু আমাদের সাফল্যের খবর আসে; কিন্তু সংগ্রাম ও কষ্টের খবর খুব একটা আসে না। অনেকে মনে করেন, এজন্য বোধ হয় সরকার বা অন্যান্য সংস্থা থেকে অর্থ পাওয়া যায়। অথচ বিভিন্ন অভিযানের খরচ জোগাতে গিয়ে আমি ৬৪ হাজার ডলার ঋণগ্রস্ত হয়েছিলাম ২০১৫ সালে। আমাকে অনেক আকর্ষণীয় চাকরি ছাড়তে হয়েছে।'

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত
জলবায়ু পরিবর্তনটা খুব কাছ থেকে দেখেন পর্বতারোহীরা। দেখেছেন ওয়াসফিয়াও। এই নিয়ে তিনি বলেন, 'আমি সর্বোচ্চ সপ্তশৃঙ্গ ছাড়াও অনেক পর্বতে গিয়েছি। তিব্বতে কাজ করার সময় ওই অঞ্চলের যে এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প, সেখানে ১৩ বার গিয়েছি। হিমালয়কে বলা হয় 'থার্ড পোল' বা তৃতীয় মেরু। আমি সেখানকার বরফ জগতে অনেক পরিবর্তন দেখেছি। বরফ স্তর পাতলা হয়ে যেতে দেখেছি। ছোটখাটো কিছু হিমবাহের পশ্চাদপসরণও চোখে পড়েছে। তবে আমি বলব, কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশ ও প্রতিবেশ বদলে যাচ্ছে না। এজন্য মনুষ্যসৃষ্ট কারণও দায়ী। আমরা হিমালয়ে যেভাবে প্রায় সারাবছর দল বেঁধে যাই, সেটা কিন্তু বিশ্বের আর কোনো পর্বতমালায় সম্ভব নয়। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে সর্বোচ্চ কতজন যেতে পারবে, তা নির্ধারণ করা আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমাতেও আমাদের অনেক করণীয় আছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমি নিজেও গাড়ি ব্যবহার করি না।'

ন্যাশনাল জিওগ্রাফি থেকে পাওয়া
২০১৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির অন্যতম বর্ষসেরা অভিযাত্রীর খেতাব পাওয়া এভারেস্টজয়ী দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী ওয়াসফিয়া নাজরীন ২০১৬ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির উদীয়মান সেরা অভিযাত্রী হিসেবেও নির্বাচিত হন। এতে প্রথম নারী হিসেবে জিওগ্রাফির এ দুটি খেতাব জয় করেন তিনি। ওয়াসফিয়া তার দুঃসাহসী অভিযানের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে নিজের অঙ্গীকার ও কর্মতৎপরতার স্বাক্ষর রাখেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ওয়াসফিয়াকে নিয়ে ২০১৬ সালের ৩০ মে প্রকাশ করে বিশেষ ডকুমেন্টারি। চাইলে িি.িুড়ঁঃঁনব.পড়স/ ধিঃপয? া=গিয়ঁ-হজগ-টপ -এই লিংকের মাধ্যমে দেখতে পারেন সেই ডকুমেন্টারি। ওয়াসফিয়া নাজরীন বর্তমানে আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করছেন। তার মতো তরুণ অভিযাত্রীরা লাল-সবুজের পতাকা ওড়াবে পৃথিবীর দেশে দেশে!