দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ। ২৫ বছরে টেলিযোগাযোগ খাত শুধু নয়, সার্বিকভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় গ্রামীণফোনের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণফোনের ২৫ বছরপূর্তিতে সমকালের সঙ্গে আলাপচারিতায় দেশের টেলিযোগাযোগ খাত ও ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী ইয়াসির আজমান।

আলাপের শুরুতে ইয়াসির আজমানের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ১৯৯৭ সালের সেই সময় এবং আজ ২০২২ সালের এই সময়- কীভাবে পার্থক্য করবেন? জবাবে তিনি বলেন, "১৯৯৭ সালেও শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার দূরদর্শী নীতির ফলেই দেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক সারাদেশে বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তিনি গ্রামীণফোনকে লাইসেন্স দেওয়ার সময় বলেছিলেন, 'কানেকটেড বাংলাদেশ' দেখতে চাই। গ্রামীণফোন সেই কথা রেখেছে। ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রামের এক নারী লাইলি বেগমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। এর মাধ্যমেই গ্রামীণফোনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে দেশজুড়ে নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে গ্রামীণফোন দ্রুত এগিয়ে যায়।"

তিনি বলেন, 'আজ ২৫ বছর পর প্রেক্ষাপট অনেকখানি বদলে গেছে। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলেই ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের রূপরেখা আসে। এরপর ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য সরকারি পর্যায় থেকেও অনেক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ২০১৩ সালে থ্রিজি এবং ২০১৮ সালে ফোরজি এসেছে। এই ২০২২ সালে ফাইভজি প্রযুক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন ভয়েস কল শুধু নয়, বরং মোবাইল ইন্টারনেট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।'

এ ধরনের পরিস্থিতিতে ফাইভজির জন্য বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, গ্রামীণফোনের প্রস্তুতিই বা কী? জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের সিইও বলেন, "প্রকৃতপক্ষে ফাইভজির জন্য বাংলাদেশে 'ইউস কেস' নেই বললেই চলে। কারণ এন্টারপ্রাইজ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরেই মূলত ফাইভজির ব্যবহার বেশি। আর সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি আরও বেশি উন্নত ফোরজি। ৩১ মার্চ বিটিআরসি বড় আকারে একটি বেতার তরঙ্গ নিলাম করতে যাচ্ছে। সেখান থেকে যে তরঙ্গ পাওয়া যাবে, সেটা ফোরজিতে নেটওয়ার্কের কোয়ালিটি নিশ্চিত করার জন্য অনেক বেশি ইউসফুল হবে। গ্রামীণফোনের মূল কোম্পানি টেলিনর গ্রুপ বিশ্বের কয়েকটি দেশে এরই মধ্যে ফাইভজি চালু করেছে। ফলে গ্রামীণফোনেরও প্রস্তুতি আছে।"

ফোরজিতে এসেও গ্রামীণফোনের অপটিক্যাল ফাইবার ব্যাকহল মাত্র ১৪ শতাংশের বেশি নয়, সে ক্ষেত্রে ফাইভজির ক্ষেত্রে আরও বড় চ্যালেঞ্জ থেকে যাচ্ছে না? এর জবাবে ইয়াসির আজমান বলেন, 'এটা সত্য যে, এখন পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার ব্যাকহল প্রয়োজনের চেয়ে কম আছে। তবে এটা বেশিদিন থাকবে না। গ্রামীণফোন দ্রুততার সঙ্গেই অপটিক্যাল ফাইবার ব্যাকহল বাড়ানোর কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন কিংবা ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে অপারেটররা পরিচালনা করতে পারে না। এর জন্য আলাদা লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান আছে। এ কারণেই ফাইবার অপটিক ক্যাপাসিটি চাইলেই অপারেটররা বাড়াতে পারে না, এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। এক্ষেত্রে যে দামে ব্যান্ডউইথ কিনলে গ্রাহককে বেশি সুবিধা দেওয়া সম্ভব, তার চেয়ে বেশি দামে কিনতে হয়।'

কলড্রপ নিয়ে খুব বেশি অভিযোগ আছে, মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও ধীরগতি এবং মাত্রাতিরিক্ত নেটওয়ার্ক ফ্ল্যাকচুয়েশন নিয়ে। এর কারণও কি যথেষ্ট ফাইবার অপটিক ব্যাকহল না থাকা? জবাবে গ্রামীণফোনের সিইও বলেন,' প্রথমে কলড্রপ নিয়ে বলতে চাই। নির্ধারিত হারের চেয়ে গ্রামীণফোনের কলড্রপের হার অনেক কম। যেখানে মোট কলের ২ শতাংশ কলড্রপ গ্রহণযোগ্য বলা আছে, সেখানে গ্রামীণফোনের কলড্রপ ১ শতাংশের নিচে। কলড্রপ আছে, এটাও সত্য। এর পেছনে বড় কারণ হচ্ছে প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক স্থানে সাইট বসাতে না পারা।'

যাত্রার শুরু থেকেই গ্রামীণফোন ১ নম্বরে, ২৫ বছর ধরে ১ নম্বরে আছে। আপনার কি মনে হয়, আগামী ২৫ বছরেও গ্রামীণফোন ১ নম্বরে থাকবে? জবাবে ইয়াসির আজমান বলেন, 'দেখুন গ্রামীণফোন বাংলাদেশে স্বপ্নের সঙ্গে এগিয়ে গেছে। একদিকে সারাদেশে নেটওয়ার্ক সরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে কানেকটেড করেছে। ফলে তাদের এমপাওয়ারমেন্ট হয়েছে, নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে স্টার্টআপ তৈরি, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে ব্যাপক ভিত্তিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ ডিজিটাল সার্ভিসের আওতায় তৃণমূলের মানুষকে সংযুক্ত করার একাধিক কার্যক্রম গ্রামীণফোনের আছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, নতুন নতুন উদ্ভাবন ও সেবা নিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্নের সঙ্গে আগামী দিনগুলোতে একই সঙ্গে পথ চলবে গ্রামীণফোন।'