স্টিভ জবস। আমেরিকান প্রযুক্তিবিদ। মাইক্রোকম্পিউটার বিপ্লবের অন্যতম অগ্রদূত। সর্বকালের অন্যতম সেরা এ প্রযুক্তিবিদের সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ অনুবাদ করেছেন শাহনেওয়াজ টিটু

রিড কলেজ ও পড়াশোনায় হোঁচট
পড়াশোনা শুরুর ছয় মাস পরই রিড কলেজ থেকে বের হয়ে যাই আমি। আবারও ভর্তি হতে লেগে গিয়েছিল ১৮ মাসের মতো সময়। মাঝখানের সময়টিতে আমি নিশ্চুপ ছিলাম। কেন ছেড়ে দিয়েছিলাম কলেজ? এর কারণটা আমার জন্মের আগের। আমার জন্মদাত্রী মা ছিলেন অবিবাহিতা, কলেজপড়ূয়া তরুণী। তিনি আমাকে দত্তক দিয়ে দেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, কলেজ পাস করা কাউকেই আমাকে দত্তক নেওয়া উচিত।

১৭ বছর পর কলেজে ভর্তি
এর ১৭ বছর পর কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম আমি। কিন্তু এমন একটি কলেজকে আমি বেছে নিলাম, যেখানে পড়াশোনার খরচ স্ট্যানফোর্ডের মতোই ব্যয়বহুল। পড়ার খরচ জোগাতে গিয়ে আমার খেটে খাওয়া বাবা-মার জমানো সব টাকা ফুরিয়ে গেল। ছয় মাস এভাবে যেতেই আমার মনে হলো, পড়াশোনার কোনো মূল্য নেই। কিন্তু জীবনে আমি করবটা কী- এ নিয়ে কোনো ধারণা ছিল না আমার; ধারণা ছিল না কলেজ কীভাবে আমাকে জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করবে- সে ব্যাপারেও। অথচ বাবা-মার সারাজীবনের জমানো সব টাকা আমি এখানেই খরচ করে বসে আছি! এ কারণেই ঠিক করলাম, কলেজ ছেড়ে দেব। মনে হলো, এর ফলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সে সময় ব্যাপারটা বেশ আতঙ্কদায়ক ছিল। কিন্তু এখন যখন অতীতে ফিরে তাকাই, তখন টের পাই, সেটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত। পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্ত থেকেই ক্লাসসংক্রান্ত সব ব্যস্ততা ফুরিয়ে গেল আমার; আর নজর দিলাম নতুন কোনো পথ খুঁজে নেওয়ার।

ঘুমাতাম বন্ধুদের রুমের ফ্লোরে
আমার নিজের জন্য কোনো রুম ছিল না। ফলে বল্পুুব্দদের রুমের ফ্লোরে আমাকে ঘুমাতে হতো। ৫ সেন্ট মূল্যে কোকের বোতল রিটার্ন দিয়ে পাওয়া টাকায় খাবার কিনতাম আমি। সপ্তাহে একদিন ভালো খাবার পাওয়ার জন্য প্রতি রোববার সাত মাইল হেঁটে শহরে, হরে কৃষ্ণ মন্দিরে যেতে হতো আমাকে। ব্যাপারটা আমার ভালোই লাগত। এই যেতে যেতে পথে যে কৌতূহল ও ভাবনাগুলো খেলে যেত মাথায়, সেটির অমূল্য ফল আমি জীবনের পরবর্তী সময়ে পেয়েছি। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক :রিড কলেজ তখন ছিল সম্ভবত দেশের সেরা ক্যালিগ্রাফি ইনস্টিটিউট। ক্যাম্পাসজুড়ে ভরে থাকা পোস্টারগুলো ছিল হ্যান্ড-ক্যালিগ্রাফির চমৎকার সব নমুনা। যেহেতু আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি, ফলে আমাকে নরমাল ক্লাসগুলো আর করতে হচ্ছে না; তাই বিষয়টি শেখার জন্য একটা ক্যালিগ্রাফি ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সেরিফ ও স্যান-সেরিফ টাইপফেস শিখলাম আমি; শিখলাম অসাধারণ টাইপোগ্রাফিকে যা সৃষ্টি করে, বিভিন্ন বর্ণের কম্বিনেশনের মধ্যে সেই শূন্যস্থানটিকে শনাক্ত করা।

'ম্যাক'-এর সৃষ্টি
জীবনে এগুলোর কোনোটাকেই কাজে লাগাতে পারব- এমন আশা ছিল না। কিন্তু দশ বছর পরে, আমরা যখন প্রথম ম্যাকিনটোস কম্পিউটারের নকশা করছিলাম, এই পাঠ তখন বড় হয়ে ধরা দিল আমার কাছে। আর তার সবটাই কাজে লাগালাম 'ম্যাক'-এর নকশায়। চমৎকার টাইপোগ্রাফি সমৃদ্ধ প্রথম কম্পিউটার ছিল এটি। কলেজে একমাত্র কোর্সটিতে যদি ভর্তি না হতাম আমি, তাহলে মাল্টিপল টাইপফেস বা আনুপাতিক স্পেসের ফ্রন্টসমৃদ্ধ 'ম্যাক'-এর সৃষ্টিই হতো না হয়তো। এরপর উইন্ডোজও এটিকে কপি করেছিল; কেননা, এগুলো ছাড়া কোনো পারসোনাল কম্পিউটারের পক্ষে মূল্যবান হয়ে ওঠা হয়তো সম্ভব নয়। ভাবি, যদি কলেজের পাঠ ছেড়ে না দিতাম, তাহলে হয়তো কোনোদিনই ক্যালিগ্রাফি ক্লাসে ভর্তি হওয়া হতো না আমার; আর এখন পারসোনাল কম্পিউটারগুলোতে যে চমৎকার টাইপোগ্রাফি রয়েছে- সেটিরও উদ্ভাবন হতো না!

বিষয় : স্টিভ জবস আমেরিকান প্রযুক্তিবিদ মাইক্রোকম্পিউটার অ্যাপল ফোন

মন্তব্য করুন