করোনা সময়ে ডিজিটাল অর্থনীতির গুরুত্ব সারাবিশ্বের কাছেই সুস্পষ্ট হয়। তাই গত দুই বছরের বাজেটের তুলনায় নতুন অর্থবছরের বাজেট নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কিছুটা বেশি। তবে তাৎক্ষণিক দৃষ্টিতে বেশকিছু সুখবর থাকলেও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু বিষয় পুর্নিবিবেচনার দাবি রাখছে।

বাজেট ও স্মার্টফোনে করারোপ প্রসঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে চাই বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট উপহার দেওয়া জন্য। বলতে গেলে ১৯৭২-৭৩ সালে ৭৮৬ কোটির টাকার বাজেট থেকে নতুন অর্থবছরে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন একটি অসাধারণ অর্জন।

ডিজিটাল সময়ে আমদানিনির্ভর দেশ থেকে উৎপাদক ও রপ্তানিমুখী দেশে রূপান্তর হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যা আজ বাস্তব ও দৃশ্যমান।

বাজেটে স্মার্টফোনের ওপর আরোপিত ভ্যাট বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীকে আবেদন করব। আপাতত যেন স্মার্টফোনে ভ্যাট আরোপ না করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে স্মার্টফোন অর্থনীতির সুবিধা পৌঁছে দিতে ভ্যাট আরোপ ডিজিটাল প্রসারের জায়গাটা কিছুটা হলেও সংকুচিত করবে।

কম্পিউটারের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট আরোপের ফলে দেশে ডিজিটাল পণ্য উৎপাদন আরও সুসংহত হবে। যা দেশের চাহিদা পূরণ করে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশকে রপ্তানিমুখী করবে। ফলে ডিজিটাল পণ্য রপ্তানি জাতীয় অর্থনীতিতে আরও সমৃদ্ধ করবে।     

বৃহস্পতিবার (৯ জুন) অর্থমন্ত্রী বাজেটে স্মার্টফোন ও ল্যাপটপে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করেছেন। ফলে ক্রেতাকে ডিজিটাল পণ্য কিনতে হবে পণ্য আগের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে। ইতিমধ্যেই ডলারের দাম বাড়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সব ধরনের আইটি বাজারে। সব ধরনের প্রযুক্তিপণ্যের দামও বাড়ছে। ডিজিটাল পণ্য ও সেবায় দাম বাড়লে ডিজিটাল রূপকল্পে কিছুটা স্থবিরতা আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। 

স্টার্টআপ ট্যাক্স

স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য ট্যাক্স রিটার্নের সঙ্গে সব ধরনের রিপোর্টিংয়ে প্রস্তাবিত ছাড়ের ফলে তারা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তা সহজ হবে। বিগত নয় বছর ধরে লোকসান দূর করে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি দেওয়া এবং ব্যয়ের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা সহায়ক হবে। স্টার্টআপের জন্য টার্নওভার ট্যাক্স ০.৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.১ শতাংশে আনায় নতুন ব্যবসায় প্রাণসঞ্চার হবে।

ডিজিটাল কারেন্সি

অর্থমন্ত্রী যে ডিজিটাল কারেন্সির স্টাডি শুরু করতে চেয়েছেন তাতে ব্লকচেইননির্ভর ডিজিটাল কারেন্সি অর্থনীতিকে গতিশীল করার সঙ্গে স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করবে।

ইন্টারনেট সেবা ব্যয়

ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের প্রাথমিক উপাদান হওয়া সত্ত্বেও ইন্টারনেট সেবাকে আইটিইএস-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তাব করা সত্ত্বেও বাজেটে তা সুনিশ্চিত হয়নি। ইন্টারনেট সেবা ‘আইটিইএস’র অন্তর্ভুক্ত হলে তা ১০ শতাংশ এআইটিসহ আইএসপিগুলিকে করপোরেট ট্যাক্স থেকে অব্যাহতি দেবে। ভোক্তাদের জন্য ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে সহজলভ্য করবে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণের ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অর্থনৈতিক কাজের পরিসর বাড়বে। সাশ্রয়ী মূল্যের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ডিজিটাল বাণিজ্য, আইসিটি ফ্রিল্যান্সিং, আইটিইএস রপ্তানিসহ নতুন ধারার ব্যবসা তৈরিতে সহায়ক হবে।

ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনারে ভ্যাট

আমদানি করা কম্পিউটার, প্রিন্টার, ল্যাপটপ, এবং টোনার কার্টিজে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অটোমেশনকে নিরুৎসাহিত করবে। সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্পে কাজ করছে। কিন্তু রাইড-শেয়ারিং, মোবাইল ব্যাংকিং ছাড়াও স্মার্টফোনভিত্তিক সেবায় অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপ রূপকল্পকে বাধাগ্রস্থ করবে।

স্টার্টআপে প্রণোদনা

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ রূপকল্পকে গতিশীল করতে স্টার্টআপ উদ্যোগকে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন বলে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু স্টার্টআপ উদ্যোক্তা ও কো-ওয়ার্কিং স্পেসের জন্য ৫ শতাংশ ভ্যাট হবে বাড়তি বোঝা। বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য টাক্স রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যে দেশে নিবন্ধিত সেই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ডাবল ট্যাক্সেশন চুক্তি থাকলে তা হবে সাংঘর্ষিক।

সফটওয়্যার-সেবায় ভ্যাট 

সরকার স্থানীয় আইটি শিল্পকে উৎসাহ দিতে এবং বিদেশি সফটওয়্যার ও সেবাকে প্রতিযোগিতামূলক করতে আইটিইএস’র ওপর ১০ শতাংশ এআইটিম ও সফটওয়্যারের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট রেয়াত দেবে। কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর প্রস্তাবিত প্রণোদনা ক্যাশলেস অর্থনীতির নবযুগের সূচনায় নিয়ে যাবে। কিন্তু সংশিষ্ট খাতে প্রণোদনা সুনিশ্চিত নয়। অন্যদিকে মোবাইল ব্যাংকিং খাতে ১২ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকার সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে প্রত্যাশিত প্রস্তাবগুলো বাজেট অধিবেশনে আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করবে। অন্য সব খাতের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির জন্যও একটি ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট এখন সময়ের দাবি বলে জানালেন মালয়েশিয়া চেম্বারের সভাপতি ও সাবেক বেসিস সভাপতি আলমাস কবীর।

বিষয় : মোস্তাফা জব্বার বাজেট স্মার্টফোন

মন্তব্য করুন