স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক ড. তোফায়েল আহমেদ ২১ জুন সমকালে 'নির্বাচন নিয়ে সংস্কার ও চর্চার সুপারিশ' শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন। সবাই একমত হবেন, সময়োপযোগী শাসন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে বর্তমানে যথেষ্ট গবেষণা নেই। সে ক্ষেত্রে ড. তোফায়েল আহমেদের কলামটি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তাঁর সুপারিশের পাশাপাশি আরও কিছু প্রস্তাবনা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। আস্থার সমাজ গড়ার স্বার্থে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে 'স্থানীয় নির্বাচন কমিশন' এবং জাতীয় পর্যায়ের গ্রহণযোগ্য দলীয়-নির্দলীয় ব্যক্তিদের সমন্বয়ে 'জাতীয় নির্বাচন কমিশন' গঠন করা উচিত। স্থানীয় নির্বাচন কমিশন একক ক্ষমতাবলে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সম্পন্ন করবে এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনও একক ক্ষমতাবলে জাতীয় প্রতিনিধিদের নির্বাচন সম্পন্ন করবে। এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে বণিক সমিতি, প্রেস ক্লাব, ছাত্র সংগঠন, শিক্ষক সংগঠন নিজেরাই নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্বাচন সম্পন্ন করছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, তারা যদি সক্ষম হয় তাহলে একই জনগণ স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন করতে কেন সক্ষম হবে না? সমানুপাতিক ভোটের ব্যবস্থা চালু হলে জাতীয় পর্যায়ে ঐকমত্য সৃষ্টি হবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে মেয়র কিংবা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে জটিলতা দেখা দেবে। সে জন্য তিনি স্থানীয় সরকারেও সংসদীয় ব্যবস্থা চেয়েছেন। আমরা দেখে আসছি, জাতীয় পর্যায়ে দলীয় বিভাজন থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে জনগণ মিলেমিশে বসবাস করে। কিন্তু স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রতীক দেওয়ায় আগেকার সেই মিলমিশে থাকার সম্পর্ক আর থাকছে না। একই সঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আগত নির্দলীয় ব্যক্তিদের নির্বাচন করার পথটি সংকুচিত করে দেওয়া হয়েছে। আবার যদি সেখানে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হয়, তাহলে প্রায়ই মেয়র ও চেয়ারম্যান পরিবর্তনের ঘটনা ঘটতে দেখা যাবে। তবে এটা ঠিক, ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকায় মেয়র ও চেয়ারম্যানরা কাউন্সিলর বা মেম্বারদের মতামতের দাম দেন না। এ দেশে প্রদেশ না থাকায় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিরা কোথা থেকে আসবেন, তা ভেবে দেখা দরকার। সে জন্য 'জেলা সরকার' ব্যবস্থা কার্যকর করে প্রতিটি জেলা সরকার থেকে দু'জন প্রতিনিধি (মোট ১২৮ জন) নিয়ে উচ্চকক্ষ করা যেতে পারে। তবে সর্বাগ্রে দুই প্রকারের সরকার ব্যবস্থা, তথা জাতীয় সরকার ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
লক্ষণীয়, সরকার, বিরোধী দল, বুদ্ধিজীবী সমাজ, এনজিওসহ সবাই 'স্থানীয় সরকার' শব্দটি ব্যবহার করছেন (যদিও সংবিধানে 'স্থানীয় শাসন' শব্দটি যুক্ত রয়েছে)। সে কারণে প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটের সঙ্গে 'সরকার' শব্দটি যুক্ত করে প্রজাতান্ত্রিক রূপ দিলে সব দলের সমর্থন পাওয়া যাবে। যেমন- ইউনিয়ন সরকার, উপজেলা সরকার, জেলা সরকার, নগর সরকার ইত্যাদি। সেই সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণের বিষয়টি মাথায় রেখে স্থানীয় ইউনিটগুলো সাজাতে হবে। প্রস্তাবিত ইউনিয়ন সরকার, উপজেলা সরকার, নগর সরকার ও জেলা সরকারের রূপরেখা সংসদীয় পদ্ধতির, না রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির হবে, তা আলোচনাসাপেক্ষ। এ ব্যবস্থায় 'জেলা সরকার' স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হিসেবে কার্যকর থাকবে। জেলা সরকার এক হাতে গ্রামীণ স্থানীয় সরকারগুলো এবং অন্য হাতে নগর সরকারগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। কেন্দ্রের সঙ্গে শুধু জেলা সরকারের সম্পর্ক থাকবে।
গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়নবিষয়ক গবেষক
musha.pcdc@gmail.com