সর্বশেষ ১৯৭২ সালে, ঠিক ৫০ বছর আগে চাঁদের বুকে পড়েছিল মানুষের পা। নাসার অ্যাপোলো মিশনের মাধ্যমে কয়েক দফায় নভোচারীরা চাঁদে গিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর পেরিয়ে গেছে অর্ধশতাব্দী; মানুষ তো দূরে থাক, চন্দ্রাভিমুখে কোনো নভোযানও যায়নি। তবে ফের চাঁদে মানুষ পাঠাতে অ্যাপোলোর পর আর্টেমিস মিশন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। আর্টেমিসের প্রথম প্রকল্প 'আর্টেমিস-১' মিশনের অংশ হয়ে চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে মহাকাশে উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেট। নাসা রকেটটিকে বলছে মেগা-রকেট। কেনই বা বলবে না, এটিই এযাবৎকাল মহাকাশে পাঠানো সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী রকেট।

চাঁদে মানব নভোচারী পাঠানোর লক্ষ্য হলেও নতুন এ মিশনের প্রথমটি 'আর্টেমিস-১' প্রোগ্রামে কিন্তু কোনো মহাকাশচারী যাচ্ছেন না। এটি নাসার পরীক্ষামূলক মিশন। চাঁদের আবহাওয়া, মানুষের শরীরে চাঁদের পরিবেশের প্রভাব প্রভৃতি যাচাইয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে এ মিশন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে রকেটটি আজ উৎক্ষেপণ করা হবে। স্থানীয় সময় আজ সোমবার সকাল ৮টা ৩৩ মিনিটে শুরু করে রকেটটি দুই ঘণ্টার মধ্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ত্যাগ করার কথা রয়েছে। গত সপ্তাহেই কেনেডি স্পেস সেন্টারের উৎক্ষেপণ প্যাডে এসএলএস এবং ওরিয়ন স্থাপিত হয়েছে। কাউন্টডাউনের জন্য প্রস্তুত থাকতে প্রকৌশল এবং প্রযুক্তি-সংক্রান্ত কর্মকর্তারা জ্বালানি, বৈদ্যুতিক এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সংযোগ করেছেন। নাসার এক্সপ্লোরেশন সিস্টেমস ডেভেলপমেন্টের সহযোগী প্রশাসক জিম ফ্রি বলছেন, 'গত ২২ আগস্ট সব ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সব ঠিক আছে। আমরা চাঁদে যাওয়ার ক্ষণ গুনছি।' অ্যাপোলো ১০ যে লঞ্চপ্যাড থেকে চাঁদের উদ্দেশে উড়েছিল, একই লঞ্চপ্যাড ব্যবহার করছে এসএলএস রকেট। যাত্রা শুরুর পর ২ লাখ ৩৯ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছাতে এসএলএস রকেটের সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। চাঁদের কক্ষপথে ৪২ দিন বিচরণের পর ১০ অক্টোবর পৃথিবীর বুকে ফিরবে এসএলএস। এটি ক্যালিফোর্নিয়া সান ডিয়েগোর কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের কথা রয়েছে।
এসএলএস রকেট-বৃত্তান্ত

গত শতাব্দীর ষাট-সত্তরের দশকে চাঁদে নভোচারী নিয়ে যাওয়া অ্যাপোলো স্যাটার্ন ভি সিস্টেমের চেয়েও শক্তিশালী। রকেটটির উচ্চতা ৩২২ ফুট। এটি স্ট্যাচু অব লিবার্টির চেয়েও উঁচু। এর আগে অ্যাপোলো মিশনের রকেটগুলো ছিল মাত্র ৪১ ফুট লম্বা। এটি ৮.৮ মিলিয়ন পাউন্ড থ্রাস্ট তৈরি করে। এসএলএসের প্রধান ইঞ্জিন ৭ লাখ গ্যালন ক্রায়োজেনিক অথবা সুপার কোল্ট প্রোপোলেন্ট উৎপাদন করে; যা একসঙ্গে আটটি বোয়িং৭৪৭এস ওপরে ধরে রাখতে পারে। এসএলএস নামের রকেটটি একটি ক্যাপসুল বহন করবে, যার নাম ওরিয়ন। নাসা মূলত তাদের স্পেস শাটলের প্রযুক্তিই নতুন এসএলএসে ব্যবহার করেছে। তবে এটি তৈরিতে নাসা হার্ডওয়্যার আপগ্রেড করেছে, পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও নির্মাণেও সর্বশেষ কৌশল ব্যবহার করেছে। এটি ৫৯ হাজার ৫০০ পাউন্ড ওজন বহন করতে পারবে। এটি একটি নতুন ধরনের রকেট সিস্টেম। কারণ, এতে তরল অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন প্রধান ইঞ্জিন এবং স্পেস শাটল থেকে প্রাপ্ত দুটি সলিড রকেট বুস্টার উভয়েরই সমন্বয় রয়েছে। একে স্পেস শাটল এবং অ্যাপোলোর স্যাটার্ন ভি রকেটের হাইব্রিড সংস্করণ বলা যায়। এসএলএস এবং ওরিয়ন তৈরিতে এক দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছে নাসা। আর সংস্থাটির এই এসএলএস এবং ওরিয়ন তৈরিতে প্রতিটির পেছনে খরচ হয়েছে ২০০০ কোটি ডলার।

আর্টেমিস-১ মিশনের লক্ষ্য
চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্যের প্রথম ধাপ হিসেবে আর্টেমিস-১ মিশনের মাধ্যমে পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহের আবহাওয়া এবং মানবশরীরের ওপর তার প্রভাব জানতে চায় নাসা। এ মিশনের প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই পরবর্তী মিশন সাজাবে সংস্থাটি। কোনো নভোচারী এ মিশনে না থাকলেও মানবদেহে কম্পন ও মহাকাশ বিকিরণের প্রভাব নিরূপণে ক্যাপসুল ওরিয়ন বহন করবে সেন্সরসমৃদ্ধ মৃত মানবদেহ। রকেটটি ফিরে আসার পর ওই মানবদেহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মানবশরীরে চাঁদের আবহাওয়া কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, তা জানবেন নাসার গবেষকরা। মহাকাশযান চাঁদের বাইরে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাবে ওরিয়ন। এ মিশনের মাধ্যমে উড্ডয়নের সময় জৈবিক সিস্টেমগুলো কী অনুভব করেছিল, ওড়ার পরে কী পরিবর্তন হচ্ছে- তা বিশ্লেষণ করা হবে। নাসা জানিয়েছে, চারটি জৈব পরীক্ষা দুটি ভাগে ভাগ করা হবে। মহাকাশের পরিবেশে এই চার ভিন্ন সিস্টেম কীভাবে সাড়া দেয়, তা বোঝারও চেষ্টা করা হবে সংগৃহীত ডাটা থেকে।

২০২৪ সালে আর্টেমিস-২ মিশনের মাধ্যমে চাঁদে ফের মানব পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে নাসার। এরপর ২০২৫ সালে আর্টেমিস-৩ মিশন পরিচালনা করবে সংস্থাটি। তবে চন্দ্রাভিযানে কারা যাচ্ছেন, তাঁদের নামধাম প্রকাশ করেনি নাসা। ২০৩০ সাল নাগাদ বা এর পরপরই নাসা নভোযাত্রীদের মঙ্গল গ্রহে পাঠাতে চায়। চন্দ্রাভিযানকেও মঙ্গল গ্রহ বিজয়ের প্রস্তুতি হিসেবেই দেখছে মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি। া

এক নজরে
- আজ উৎক্ষেপিত হচ্ছে আর্টেমিস ১ মিশনের এসএলএস রকেট।
- রকেটটির উচ্চতা ৩২২ ফুট। এ পর্যন্ত মহাকাশে পাঠানো রকেটের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী।
- ১০ বছর ধরে তৈরি এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন ক্যাপসুল নির্মাণ ব্যয় ৪০ বিলিয়ন ডলার।
- ওরিয়ন চাঁদের কক্ষপথে ৪২ দিন ঘুরে ১ অক্টোবর ফিরবে।