একপাশে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা ঝরনা; পাথুরে নদী সিলেটের ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহু গুণে। ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরের জন্য সুপরিচিত হলেও, কালো পাথরের জন্য পরিচিত উৎমাছড়া ও তুরংছড়া। নয়ন শীতল করা এ দুটি স্থান নিয়ে লিখেছেন উম্মে সালমা কুন্তলা

দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট। চায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সিলেটের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আপনাকে বিমোহিত করবে সন্দেহ নেই। সিলেটে বেড়াতে গেলে সবাই সাদা পাথর বিছানো জাফলং, বিছনাকান্দি আর ভোলাগঞ্জ ঘুরে দেখতে চান। আমি এবার একটু ব্যতিক্রমী জায়গায় বেড়াতে চাই। আহরণ করতে চাই ভিন্ন স্বাদ। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম কালো পাথর বিছানো উৎমাছড়া আর তুরংছড়া। উৎমাছড়া সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রনিখাই ইউনিয়নের বিজয়পাড়া গ্রামে অবস্থিত। কালো পাথর বিছানো সেই সৌন্দর্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম।

অক্টোবরের এক সকালে বাসা থেকে বাসস্ট্যান্ড চলে গেলাম সবাই। ইচ্ছা ছিল দোতলা বিআরটিসি বাসে করে যাব। হীরা ভাবি বলছিলেন, বাস যখন চা বাগানের ভেতর দিয়ে যায়, তখন চা বাগানের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এ জন্যই দোতলা বিআরটিসি বাস পছন্দ করেছি। কিন্তু স্ট্যান্ডে গিয়ে জানলাম দোতলা বাস ৯টার আগে ছাড়বে না। আমরা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গেছি সকাল সাড়ে ৭টায়। অগত্যা সাধারণ বাসে করে রওনা দিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য প্রথমে ভোলাগঞ্জের দয়ারবাজার যাওয়া। বাসে উঠে দেখি পর্যটকে ভরা। সবাই ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর দেখতে যাচ্ছে। ওরা বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গান শুরু করে দিল। যেহেতু বেড়ানোর মুডে আছে। সুতরাং মজা করতে করতেই যাচ্ছে।

আমরা এয়ারপোর্ট রোডের মালনীছড়া চা বাগান পেছনে ফেলে সামনে এগোচ্ছি। গত সপ্তাহে মেরী ভাবির নেপাল ভ্রমণের গল্প শুনতে শুনতে চলে এলাম ভোলাগঞ্জের আগে দয়ারবাজার ব্রিজের কাছে। এবার দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করলাম ছড়ারবাজার যাওয়ার জন্য। ধলাই ব্রিজ থেকে ছড়ারবাজারের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। ধলাই ব্রিজে নেমে পেছনে চেরাপুঞ্জি পাহাড় আর ধলাই নদের স্বচ্ছ জলরাশিকে সঙ্গে নিয়ে সবাই মিলে কিছু ছবি তুললাম। এর পরে গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ দিয়ে রওনা হলাম। রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। যেহেতু অক্টোবর মাসে গিয়েছি, সেহেতু নদীতে পানি নেই। নৌকায় করে যেতে পারিনি। তাই সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে গিয়েছি। বাংলার সবুজ ধানক্ষেত পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম উৎমাছড়ায়। স্থানীয় লোকের কাছে উৎমাছড়া আর তুরংছড়া 'কালো পাথর' নামে পরিচিত।

বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী মেঘালয়ের পাদদেশে উৎমাছড়ার অবস্থান। সব জায়গার মতো এখানেও বাংলাদেশের অংশটুকুতে কোনো বড় পাথর নেই, কিন্তু ওই দূরে ভারতের অংশে বিশাল বিশাল কালো পাথর দাঁড়িয়ে আছে। বর্ষায় পানি বেশি থাকলেও পরে পানি কমে যায়। এর পরও ছোট ছোট ছড়া ছিল। আমরা এগুলোর মধ্যে নেমে পড়ি। আহা, হিম শীতল ঠান্ডা পানির ছড়া দিয়েছে প্রশান্তির ছোঁয়া। মেঘালয় থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা পানির ছড়ায় স্থানীয় শিশুদের মাছ ধরা দেখে প্রশান্তি পেলাম। সবচেয়ে ভালো লেগেছে এখানে কোনো চিপসের প্যাকেট, বিস্কুট বা চকলেটের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল পড়ে নেই। একদম পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। পর্যটক কম যায় বলে এত ঝকঝক করছে।

আমরা প্রচণ্ড রোদ উপেক্ষা করে বেশ কিছুক্ষণ উৎমাছড়ায় থেকে পরের গন্তব্য কালো পাথরের রাজ্য তুরংছড়ায় রওনা দিলাম। উৎমাছড়া থেকে তুরংছড়ার দূরত্ব পাঁচ কিলেমিটার। পুরোটা পথ হেঁটেই যেতে হবে। সঙ্গীরা কেউ রাস্তা চেনেন না। সেখানের একটি ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম। একদম গ্রামের বাড়িঘরের উঠোন, পুকুরপাড়, গোয়ালের পাশ দিয়ে তুরংছড়ায় যেতে হবে। কিছুদূর গিয়ে আমরা ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় একটি গাছের ছায়ায় বসেছি। কিন্তু বিকট শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। খুঁজতে খুঁজতে শব্দের রহস্য পেয়ে গেলাম। বাংলাদেশের বর্ডার ঘেঁষে মেঘালয় পাহাড়ে ওরা মেশিন দিয়ে পাথর কেটে রাস্তা বানাচ্ছে।

মনটাই খারাপ হয়ে গেল। রাস্তা হয়ে গেলে তখন হয়তো এই সুন্দর ছিমছাম, পাখিডাকা গ্রামের পরিবেশ আর থাকবে না। আবার হাঁটা শুরু করলাম। জঙ্গল ছাড়িয়ে ধানক্ষেত, ধানক্ষেতের আইল ছাড়িয়ে বন, ঝিরিপথ, পাথর ছড়ানো পথ- সবকিছু পার হয়ে গেছি আমরা। সিনেমার ছবির মতো সুন্দর লাগছিল এই বুনোপথ। সঙ্গে করে নিয়ে আসা বোতলের পানি শেষ। ওখানে কোনো মিনারেল ওয়াটার পাওয়া যায় না। অগত্যা একটি সুন্দর বাড়িতে ঢুকে টিউবওয়েলের পানি বোতলে ভরে নিলাম। পানির স্বাদ ট্যাংয়ের শরবতের মতো মনে হলো। কী যে বিদঘুটে! যাই হোক, তৃষ্ণার্ত ও বিষণ্ণ মন নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। ঘণ্টাখানেক হাঁটতে হাঁটতে কাঙ্ক্ষিত কালো পাথরের রাজ্য তুরংছড়ায় পৌঁছালাম।

প্রকৃতির খেয়ালে গড়া নিখুঁত ছবির মতো সুন্দর জায়গা তুরং। দুই পাশে উঁচু পাহাড় আর মাঝখানে সাজানো বড় বড় কালো পাথরের ভেতর থেকে স্বচ্ছ পানি বয়ে যাচ্ছে ওই দূরে। স্থানটির দৃশ্যে আমরা মুগ্ধ। আমি দলবল রেখে দূরে একটি জায়গায় একা চুপচাপ বসে শুধু অনুভব করছি প্রকৃতির নিস্তব্ধতা এবং সৃষ্টির রহস্য। তুরংছড়াও মেঘালয়ের পাদদেশে, অর্থাৎ একদম পাহাড়ের গা-ঘেঁষে নিচে অবস্থিত। এখানে কোনো তারকাঁটার বেড়া নেই। ঘণ্টাখানেক তুরংছড়ার সৌন্দর্য উপভোগ করে গাছের ছায়ায় গিয়ে সবাই বসলাম। এবার ফেরার পালা। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার পরে হঠাৎ কৃষ্ণ বলল, আপু এখান থেকে বিছনাকান্দি যাওয়া যায়। কাছেই, যাবেন নাকি?

কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই আমরা পথ পাল্টে রওনা হলাম বিছনাকান্দির উদ্দেশে। তুরং থেকে কিছুদূর যাওয়ার পরে ছড়াতেই দেখছি একজন অল্পবয়স্ক নারী আর কয়েকটা মেয়ে শিশু বড় একটি সুতির শাড়ি দিয়ে মাছ ধরছে। দেখলাম ছোট ছোট মাছ দিয়ে হাঁড়ি ভর্তি। ছড়া পার হয়ে একটি খোলা মাঠের ভেতর দিয়ে হাঁটছি আমরা। ধানক্ষেত, ছড়া, বড় বড় মাঠ পেরিয়ে অবশেষে বেশ চওড়া একটি মাটির রাস্তা পেলাম। আরও ছয় কিলোমিটার হেঁটে বিছনাকান্দিতে পৌঁছলাম। বিছনাকান্দির ভাসমান রেস্টুরেন্টে পেট ভরে ভাত, ডাল, আলু আর হাঁসের মাংস খেলাম।

পাহাড়, নদী, ঝরনা আর পাথরের এক সম্মিলিত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই বিছনাকান্দি। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত বিছনাকান্দি মূলত একটি পাথর কোয়ারি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে খাসিয়া পাহাড়ের অনেক ধাপ দু'পাশ থেকে এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। পাহাড়ের খাঁজে রয়েছে সুউচ্চ ঝরনা। পর্যটকদের জন্য এ স্পটের মূল আকর্ষণ হলো, পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পানিপ্রবাহ। বিছনাকান্দির পর্ব শেষ করে আমরা এবার বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। সঙ্গী মাহফুজ, কৃষ্ণর গান শুনতে শুনতে আর পিয়াইন নদীর দুই পাশের গ্রাম্য সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এসে পৌঁছলাম হাদারপাড়ে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় অবশেষে রাত ৮টায় বাসায় পৌঁছলাম।

বিষয় : ভ্রমণ ভোলাগঞ্জ

মন্তব্য করুন