‘স্তালিনকে মহামানব হিসেবে দেখাইনি’

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০১৯     আপডেট: ১৫ জুন ২০১৯      

সমু সাহা

কামালউদ্দিন নীলু

কামালউদ্দিন নীলু। নির্দেশক। গত ১০ থেকে ১২ জুন শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয় তার নির্দেশিত নাটক 'স্তালিন'। নাটকের নানা প্রসঙ্গ এবং থিয়েটার ভাবনা নিয়ে কথা হলো তার সঙ্গে-

একুশ শতকে এসে স্তালিন নিয়ে নাট্যপ্রযোজনা কেন প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে?

আমার মনে হয়েছে ইতিহাস নিয়ে কাজ করার এখনই ভালো সময়। অতীতেও বেশ কয়েকটি রাজনীতিভিত্তিক নাটক মঞ্চে এনেছিলাম। 'স্তালিন' মঞ্চে আনার জন্য দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল। একসময় বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। মূলত সে জায়গা থেকে স্তালিন করতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। তবে এর জন্য আমাকে নতুনভাবে স্তালিন সম্পর্কে গবেষণা করতে হয়েছে। কিন্তু এটিকে সরাসরি নাটক বলতে চাচ্ছি না। বিভিন্ন বই থেকে উৎস সংগ্রহ করে এর পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়েছে। তাই স্তালিনকে ড্রামাটার্জিক্যাল ওয়ার্ক বলাই শ্রেয়। দ্বিতীয়ত, আমার কাছে থিয়েটারকে মনে হয় 'সায়েন্স অব ইমাজিনারি সলিউশন'। থিয়েটারের বিভিন্নরকম ফর্মকে কীভাবে এক ফ্রেমে আনা যায়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আরেকটা এক্সপেরিমেন্টের জায়গা ছিল- থ্রি ডাইমেনশনকে ভেঙে কীভাবে টু ডাইমেনশনে আনা যায়। এ ছাড়া রাশান স্কুলের অ্যাক্টিং মেথড নিয়ে আলাদা আগ্রহ রয়েছে। স্তানিস্লাভস্কি থেকে শুরু করে মায়ারহোল্ড, মাইকেল চেখভ, বের্টোল্ট ব্রেখটের থিওরিকে একত্রিত করে এবং নিজস্ব ভাবনার সংমিশ্রণে নিরীক্ষাধর্মী কাজ করার প্রয়াস থেকে স্তালিন মঞ্চে নিয়ে এসেছি।

যে উদ্দেশ্য নিয়ে 'স্তালিন' মঞ্চে এনেছেন, তা কতটুকু সফল হয়েছে বলে মনে করেন?

ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, শতভাগ সফল হয়েছি। নাটক নিয়ে দর্শকের যে প্রতিক্রিয়া, তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এটা ঠিক, স্তালিন নিয়ে অনেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা হবে, এটাই শিল্পের সার্থকতা। স্তালিন বন্ধের জন্য একদল লোক শিল্পকলা একাডেমিতে অবস্থান নিয়েছিল, আবার এটি যেন প্রদর্শিত হয়, তা নিয়েও অনেকে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। বাংলা নাটকের ইতিহাসে এটি স্মরণীয় ঘটনাও বটে। এ প্রযোজনাটি প্রমাণ করল, থিয়েটার অনেক শক্তিশালী মাধ্যম।

অনেকের অভিযোগ, এর মাধ্যমে আপনি সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন...

এমন বক্তব্য আমলে নিতে চাই না। কারণ, এর আগেও বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চে এনেছিলাম। তখনও অভিযোগ করা হয়েছিল- নাটকের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র তুলে ধরতে চেয়েছি। আবার কখনও আমাকে অনেকে দালাল বলেও দুর্নাম করেছেন। আসলে কিছু মানুষ কখনোই যুক্তি দিয়ে কথা বলতে চায় না। একটা ঐতিহাসিক নাটক মঞ্চে আনলে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তার জন্য নাটক বন্ধ করে দিতে হবে! স্তালিন দিয়ে এক ধরনের ভাবনা সবার কাছে দাঁড় করিয়েছি। তারা পারলে পাল্টা যুক্তি দিয়ে তা বিশ্নেষণ করুক। প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ কখনোই এমন উগ্র হতে পারে না। 

কিন্তু সেই সময়ে আপনাকেও উচ্চবাচ্য করতে দেখা গিয়েছিল...

আমি ওই ব্যক্তিদের থামাতে চেয়েছিলাম। তাদের বোঝাতে চেয়েছি, এখানে নিজে বানিয়ে কিছু লিখিনি। সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সাইমন সিব্যাগ মন্টিফিওরের 'স্তালিন :দ্য কোর্ট অব দ্য রেড জার', সেভৎলানা অ্যালিলুয়েভার 'অনলি ওয়ান ইয়ার' ও 'টোয়েন্টি লেটার্স টু আ ফ্রেন্ড', ডেভিড পিনারের 'দ্য টেডি বিয়ার্স পিকনিক' এবং রোজমেরি সুলিভানের 'স্তালিন্স ডটার'। স্তালিনকে মহানায়ক হিসেবে দেখাইনি। এটিই স্তালিনের ট্র্যাজেডি। কিন্তু তারা না পড়েই সব জানে বলে উচ্চবাচ্য করেছেন। ওই চার ব্যক্তির মূল উদ্দেশ্যই ছিল এমন ঘটনার জন্ম দিয়ে আলোচনায় আসা। তারা মূলত মার্কসিজম না পড়েই মার্কইস্ট সাজতে চেয়েছে।

দেশের সামগ্রিক থিয়েটার চর্চাকে কীভাবে দেখছেন?

থিয়েটার নিয়ে আমি আশাবাদী। তবে বেশ কিছু আক্ষেপের জায়গাও আছে। কিছুদিন আগে সিলেট শিল্পকলা একাডেমির অবস্থা দেখে হতবাক হয়েছিলাম। সেখানে লাইটের জন্য যথেষ্ট বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সস্তা মানের লাইট দিয়ে দায়সারাভাবে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। খুবই দৈন্যদশা অবস্থা। এ ছাড়া বেশিরভাগ জেলা শহরগুলোর অডিটরিয়ামের অবস্থাও নাজুক। এ ক্ষেত্রে সবাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকে দোষারোপ করেন। কিন্তু থিয়েটারে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসতে হবে। শুধু সরকারি অর্থায়নের আশায় থাকলে এ দেশে কখনও পেশাদারি থিয়েটার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।