১১ এপ্রিল সমকালের প্রথম পাতায় একটি খবর প্রকাশ হয়, 'আক্রোশে বাবুই পাখির বাসায় আগুন!' ক্ষেতের ধান খাওয়ায় পাখির বাসায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন ঝালকাঠির এক কৃষক। এতে বাবুই পাখির ৩৩টি বাচ্চা পুড়ে মারা যায়। এই খবরটি পড়ার পর মনটা বিষাদে ভরে গেল। ৩৩টি ছানার মা পাখি, বাবা পাখি কেমন ছটফট করছে সেটা ভাবতে পারছি না। মানুষ মানুষের শত্রু হয়ে অনেক বীভৎস রূপ ধারণ করে। তাই বলে মানুষ পাখিরও শত্রু হয়ে পাখির নীড়ে আগুন দিয়ে শিশু পাখিদের মেরে ফেলতে পারে? পাখিদের সামনে মানুষ হিসেবে আর মুখ দেখাব কেমন করে?

পাখি ক্ষেতের ধান খাবে- এ তো পাখিরা চিরদিনই করে আসছে এই বাংলায়। অতিথি সিনেমায় আমরা দেখি চঞ্চল মেয়ে শাবানা দিগন্তপ্রসারী ফসল ভরা মাঠে পাখি তাড়াতে তাড়াতে গান গায় 'ও পাখি তোর যন্ত্রণা আর তো প্রাণে সয় না ...' মধুর যন্ত্রণা! সারা বছর ধরে কষ্ট করে কৃষক ফসল ফলায়, আর পাখি এসে ভাগ বসায়। তাই তো আবহমান বাংলার চিরপরিচিত ছড়া 'বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে'। বুলবুলি ধান খেয়েছে বলে বুলবুলিকে শাস্তি দেওয়ার কথা কারও মনে আসেনি। বরং জমিদারকে খাজনা না দেওয়ার কথা ভাবছেন কৃষক। কাকতাড়ুয়া তো রীতিমতো আমাদের লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কাকতাড়ুয়ার মতো শক্তিশালী আর কোনো জড়জীব পৃথিবীতে আছে বলে আমার মনে হয় না। পাখিকে ভয় দেখাতে, তাড়াতে মানুষের অবয়ব সৃষ্টি করে মাঠে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। শুধু কি পাখি? কখনও কখনও মানুষও বিভ্রমে পড়ে যায় কাকতাড়ুয়া দেখে। আমার শৈশব-কৈশোর গ্রামে কেটেছে। আমার বাবা ছিলেন ক্ষুদ্র কৃষক। ছোটবেলায় ধানক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে বাবুই পাখি তাড়িয়েছি কত দিন। পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েদের ওপরই এই কাজটি বর্তাতে দেখেছি। গাছের পাকা আম, জাম, লিচুসহ নানাবিধ ফল পাখি এবং বাদুড়ের হাত থেকে বাঁচাতে গাছের ডালে টিন বেঁধে লম্বা দড়ি টেনে আনা হতো ঘরের ভেতর, রাত-বিরাতে বয়োবৃদ্ধ নানি-দাদিদের দেখতাম দড়ি টেনে পাখি তাড়াতে। এভাবে পাখির সঙ্গে গড়ে উঠেছে আমাদের অম্লমধুর সম্পর্ক।

আমরা কি একচোখা দানবের মতো পাখির ফসল খাওয়াই দেখব। পাখি যে পরিমাণ পোকা-মাকড়, ময়লা আবর্জনা খায় সেটা দৃষ্টির বাইরে থাকবে। পঙ্গপালের আক্রমণে মহাদেশের পর মহাদেশের ক্ষেতের ফসল বিনাশ হয়ে যায়। পঙ্গপালের দমনে পাখিই ত্রাতার ভূমিকা পালন করে। ঈশ্বরকাঠির বোকা কৃষককে কে বোঝাবে পাখির দানের কথা।

বাসাবো, সবুজবাগ, ঢাকা

মন্তব্য করুন