বিএনপির সংসদ সদস্য ও আইনজীবী রুমিন ফারহানা যেমন গুছিয়ে কথা বলেন, তেমনই গুছিয়ে লেখেন। একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে হয়তো এই গুণ তিনি উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছেন। এ জন্য দলমত নির্বিশেষে সবার প্রশংসাও পান তিনি। কিন্তু মুশকিলের দিকটি হলো- তিনি অনেক সময় অযৌক্তিক বিষয়ও যুক্তি দিয়ে সাজিয়ে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই সূক্ষ্ণ পার্থক্য ধরাটা সহজ নয়। আমাদের মিডিয়ার পরিচিত আরও অনেক মুখের মতো তার মধ্যেও কেবল অন্যের সমালোচনা করার প্রবণতা প্রবল। নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে তিনি খুব বেশি বলেন না।

যেমন, গত ৯ এপ্রিল তিনি দৈনিক সমকালে একটি নিবন্ধ লিখেছেন করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের 'ব্যর্থতা' নিয়ে। তার এই নিবন্ধ পড়লে মনে হবে, গত বছর করোনারভাইরাস দেশে শনাক্ত হওয়ার পর থেকে সরকার একটি কাজও ঠিকমতো করতে পারেনি। তারা যা করেছে সবই ভুল। এক বছর সময় পেয়েও কোনো লাভ হয়নি। 'যে সুযোগ পেয়েও হারিয়ে ফেলেছি' শীর্ষক নিবন্ধের শেষ অনুচ্ছেদে তিনি লিখেছেন- 'একের পর এক অবহেলা, অব্যবস্থাপনার কারণে করোনা ভয়ংকর বীভৎসতা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আক্রান্ত, মৃত্যু আর বিনা চিকিৎসায় বিভিন্ন হাসপাতালে ঘোরার ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ আকাশ স্পর্শ করবে খুব নিকট ভবিষ্যতেই। এরপরও কি সরকারের নূ্যনতম টনক নড়া দেখতে পাব না?'

রুমিন ফারহানার এই পর্যবেক্ষণ আংশিক সত্য। এটা ঠিক, হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় শয্যার অভাব দেখা দিয়েছে। কিন্তু রুমিন যদি চোখ তুলে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর দিকে তাকাতেন, তাহলে দেখতেন যে, তাদের অনেকের চেয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভালো। ইউরোপ ও আমেরিকার উন্নত দেশগুলো যেখানে করোনা পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে; সেখানে বাংলাদেশ প্রথম থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। বাংলাদেশের মতো দেশকে জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সঙ্গে জীবিকা নিশ্চিত করার দিকেও যে মনোযোগ দিতে হয়, রুমিন ফারহানা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন।

মনে রাখতে হবে, করোনা মহামারি গোটা বিশ্বের জন্যই অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এর আগে কখনও এই ভাইরাস মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর নেই। উন্নত অনেক রাষ্ট্রকেও তাই 'ট্রায়াল অ্যান্ড এরর'ভিত্তিক কাজ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো সমাজ ব্যবস্থায় মহামারি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন। তাই যতটুকু সাফল্য সরকারের রয়েছে, রুমিন ফারহানার মতো শিক্ষিত, সৎ ও বিবেকবান রাজনীতিকের উচিত সেগুলোকে মুক্তকণ্ঠে সাধুবাদ জানানো। প্রয়োজনে পরামর্শ দিতে পারেন তিনি, ঢালাও সমালোচনা নয়।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার মূল সূত্র হচ্ছে- যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করা। এ ক্ষেত্রে রুমিন ফারহানার কাছে বিনীত প্রশ্ন, এই পরিস্থিতিতে তার দল বিএনপি কী করছে? তিন দফা ক্ষমতায় না থাকলেও দলটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থকগোষ্ঠী দেশব্যাপী ছড়িয়ে রয়েছে। বিএনপির হাইকমান্ড কি তাদের কোনো নির্দেশনা দিয়েছে, যাতে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেয়? বিএনপিতে অর্থশালী ও বিত্তশালী নেতার সংখ্যা কম নয়। আমার প্রশ্ন, তাদের ক'জন করোনা পরিস্থিতিতে অসহায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়েছে?

অন্যকে সমালোচনা সহজ, নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য পর্যালোচনা করা কঠিন। রুমিন ফারহানার মতো রাজনীতিবিদদের কঠিনেরেই ভালোবাসতে হবে।

শিক্ষক, উত্তরা, ঢাকা

মন্তব্য করুন