বারান্দায় রোদ্দুর

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০১৯      

সারাহ্‌ দীনা

মধ্যবিত্তের বারান্দাজুড়ে গল্প। ভালো লাগা, ভালোবাসা, অপেক্ষা, নির্ঘুম রাত, ঝগড়া, কান্না, অভিমান... কী নেই সেখানে! মোবাইল ফোনের আগের দিনগুলোতে বারান্দা বিশাল ভূমিকা রাখত প্রেমে। কিছুটা অপ্রেমেও। দুই বারান্দায় দৃষ্টি বিনিময় থেকে ঘর বাঁধার গল্প সংখ্যায় কম নয়। বারান্দা একরাশ অনুভূতির রাজ্য। প্রিয়জন ফেরার অপেক্ষায় বারান্দার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে কেটে যায় কত বিকেল কিংবা সন্ধ্যা! রূপার মতো হাজার জন তাদের হিমুর অপেক্ষায়, বারান্দায়। আবার, নির্ঘুম রাতের বিষণ্ণতা বিছিয়েও সেই বারান্দাতেই ঠাঁই। শুধুই কি একলা একাই প্রহর কাটে বারান্দায়? না, তা তো নয়। মন-তৃষ্ণা নিবারণ যার স্বরে, মোবাইল ফোনে তার নম্বর দেখে অজান্তেই বারান্দায় ছুট তরুণীর। নির্ভরতা বারান্দাতে। আবার লাল-নীল সংসারে দু'জন মিলে স্বপ্ন দেখাও সেখানেই। চিলতে রোদ পাখনা মেলে খুব সকালে। ভোর ভোর অ্যালার্ম। ঘুমচোখে বারান্দায় মৃদু আলো। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা দেয় না অবসর। অফিস মানে সকাল-বিকেল নয় আর। বদলে হয়েছে ভোর-রাত। অল্প বিরতিতে অবকাশ বিলাসিতা। তবুও মেঘের ডানায় তাকিয়ে হারিয়ে যাওয়ার সাধকে বাধা দেওয়া কঠিন। আয়ের আগেই ব্যয় নিয়ে ভাবতে হয় যাদের, তাদের পুরো বাড়িতেই থাকে মানিয়ে নেওয়া আর মেনে নেওয়ার রেশ। বসার ঘর থেকে বারান্দা সবখানেই হিসাবের সমীকরণ। তারপরও কথা থাকে। বাসার কোণের এক টুকরো বারান্দা যেন এক টুকরো খোলা মাঠের সন্ধান দেয়। কিংবা সমুদ্রের মুক্ত হাওয়ায় উড়ে বেড়ানোর স্বাদ। বাতাসে হেমন্তের সুবাস। হালকা মিহি শিশির ছুঁইয়ে ভোর হয়। বারান্দার টুকরো সবুজ লজ্জাবতীর মতো মুখ লুকোয়। সেই আধো লাজ ভাঙে কমলা নরম রোদে। এমন সময় এককাপ গরম চা হাতে পুব আকাশে নিষ্পলক ভালো লাগা। বারান্দাই তাই একমাত্র ভরসা।

বর্গফুটের হিসাবে বারান্দার হিসাব আর্কিটেক্টদের। এ বিষয়ে কথা হয় কারিশমা শামসের সঙ্গে। তিনি কাজ করছেন স্থাপত্য অধিদপ্তরে সহকারী স্থপতি হিসেবে। বারান্দা নকশার গল্পে তিনি বলেন, 'নর্থ ও ওয়েস্টে জানালা লাগোয়া বারান্দা হয়। যাতে রোদ বাফার হয়ে তবেই ঘরে প্রবেশ করে। আর আমাদের দেশে বারান্দা হয় ঘরলাগোয়া। দারজা খুলেই এখানে অবকাশের বারান্দা। শহরের বেশিরভাগ বাড়ি খুব কাছাকাছি হওয়ার কারণে পুরো নকশাতেই ব্যক্তিজীবনের নিজস্বতাকে ধরে রাখার মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। তাই বড়সংখ্যক বারান্দার নিচের অংশেই দেখা যায় সলিডের ব্যবহার। আর উপরের অংশে ব্যবহার করা হয় গ্রিল। তবে পুরোটা গ্রিলেও বারান্দার নকশা হয়। একই কারণে সিলিংয়ে ব্যবহার করা হয় ড্রপ ওয়াল। দূর থেকে এর ফলে ঘরের ভেতরের অংশ দূর থেকে দৃশ্যমান হয় না। আবার শখের গাছের ব্যবস্থাও করা যায় এখানে। আবার পুরোটাজুড়ে গ্রিল থাকার কারণে লতানো গাছেও বারান্দা সবুজে ছেয়ে যায়।'

সবুজে সচেতন শহরবাসী। বছরের বেশিরভাগ সময়ের উষ্ণ আবহাওয়ার এই দেশে ছায়াবীথিতলের আবেশ খুঁজে পাওয়া দায়। বারান্দাই তাই এক টুকরো ভরসা। এ কারণেই সবুজে সাজিয়ে নেয় বারান্দা। ছোট টবে বারান্দার বাগান বহু বছরের এক চর্চা। বাগান করার শখ তো বাঙালির মনের অতল গভীরে থাকবেই। সেই ছোটবেলায় পরীক্ষার খাতায় আমার শখ রচনাতে 'বাগান করা' লিখেছে কত কিশোর-কিশোরী। এখনও অনেকের দিনের শুরু একখণ্ড সবুজের যত্নে। বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠান গ্রিন সেভার্স ভার্টিক্যাল গার্ডেন নিয়ে জোরেশোরে কাজ করছে। এ বিষয়ে কথা হয় গ্রিন সেভার্সের প্রতিষ্ঠাতা আহসান রনির সঙ্গে। তিনি বলেন, 'মানুষমাত্রই সবুজের প্রতি আকর্ষণ চিরন্তন। প্রাকৃতিকভাবেই মানবজীবনে গাছের কোনো বিকল্প নেই। শহুরে লোকজন নিত্যদিনের জীবনে সবুজের সমারোহ চায়। চায় বিশুদ্ধ বাতাস। কিন্তু ইট-কাঠের শহরে সেভাবে সম্ভব নয় এ চাহিদা পূরণ। লাগোয়া বাড়ির কংক্রিটের জঙ্গল এ শহর। এখানে নিজের জায়গা করে নেওয়াই দায়। বাড়তি জায়গা নেই। আর থাকলেও তা মধ্যবিত্তের নাগালে নেই। আবার নগরের বাতাসে ধুলার আস্তরণ। নানা রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নাগরিক। বাইরে তো বটেই, ঘরের চার দেয়ালের মাঝেও নেই বিশুদ্ধ বাতাসের খোঁজ। ভার্টিক্যাল গার্ডেনে পলিউশর ডাস্ট অ্যাবসোরবেন্ট গাছ ব্যবহার করা যায়, ফলে ঘরে ধুলার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা যায় বেশ খানিকটা। নিষ্প্রাণতাও বেশ ঢেকে যায় একখণ্ড সবুজের চোখ জুড়ানো প্রশান্তির আবেশে। এসব কারণে জনপ্রিয়তা বাড়ছে ভার্টিক্যাল গার্ডেনের।'

আমাদের দেশে ভার্টিক্যাল গার্ডেন তৈরি করার বিষয়ে রনি বলেন, 'আমাদের দেশে বাড়ির স্থাপত্য নকশা ভার্টিক্যাল গার্ডেন করার জন্য উপযোগী। কেননা, এখানে বারান্দায় ভার্টিক্যাল খালি জায়গা পাওয়া যায়। আবার বেশিরভাগ বারান্দাতেই নিরাপত্তাজনিত কারণে গ্রিল দেওয়া থাকে। যেখানে টব ঝুলিয়ে খুব সহজেই তৈরি করা যায় ভার্টিক্যাল গার্ডেন। আলাদা করে কোনো ফ্রেম দরকার হয় না।'

জরুরি একটি তথ্য দিলেন আহসান রনি। তিনি বলেন, 'বর্তমানে দেশেই তৈরি করা যায় ভার্টিক্যাল গার্ডেনের জন্য প্রয়োজনীয় টক, ফ্রেম। তাই খরচ কমেছে অনেকটাই। আর ভার্টিক্যাল গার্ডেনের গাছও দুষ্প্রাপ্য নয়। গাছ বেছে নেওয়ার সময় মনে রাখতে হবে যেন তা অগভীরমূলীয় হয়।'

বারান্দার ইন্টেরিয়র প্রভাব তৈরি করে নিত্যদিনের জীবনে। তাই আপনার প্রিয় বারান্দা আপনি ঠিক কীভাবে সাজাতে চান নিজেকে প্রশ্ন করুন। বারান্দায় যদি দীর্ঘ সময় কাটানোর পরিকল্পনা থাকে আপনার, তাহলে প্রথমেই বসার জায়গা তৈরি করার বিষয় নিয়ে ভাবুন। কেননা, দীর্ঘ সময় তো দাঁড়িয়ে থাকবেন না আপনি, তাই না? বারান্দার যে স্থানে বসার ব্যবস্থা করবেন, সেখানের আলো-ছায়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি রোদ আপনার জন্য অস্বস্তির কারণ হবে। বরং এক টুকরো ছায়া বেছে নিন। বসার ব্যবস্থা স্থায়ী না হলেই ভালো। অস্থায়ী অথবা সাময়িক স্থায়ী করুন। এতে আপনার সুবিধা হবে স্থান পরিবর্তন করতে। কেননা, বৃষ্টি তো আমাদের দেশে বছরের লম্বা সময় ধরে থাকে। বসার স্থান পরিচ্ছন্ন রাখুন। আসনের খুব কাছে গাছ রাখবেন না। এতে গাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার অবসরে গা এলিয়ে বসার জায়গা যদি খুব সংকীর্ণ হয়, তবে বসে শান্তি কোথায়?

বসার স্থান খুব উঁচু অথবা খুব নিচু থেকে মাঝারি হলে ভালো হয়। মাঝে মধ্যে মাথা তুলে আকাশ দেখে নিতে পারবেন। চেয়ার রাখতে চাইলে বেতের বা কাঠের বেছে নিন। বারান্দার গ্রিল থেকে কিছুটা দূরে রাখুন। নয়তো প্রখর রোদ কিংবা শীতল বৃষ্টি, যেটাই হোক না কেন দুশ্চিন্তা ভোগাবে আপনাকে।

বারান্দায় গাছ রাখুন টবে। মাঝারি সাইজ টব ভালো লাগবে। টবের আকারের ক্ষেত্রে খুব বেশি উপর-নিচ না হলেই ভালো। এক আকারের টব ছন্দ তৈরি করবে। আবার কয়েক আকারেও হতে পারে ছন্দ মিল। সে ক্ষেত্রে ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বারান্দার এক কোনা সবুজ করে নিন। বৃক্ষের সতেজতা শান্তি পৌঁছে দেয় মনের গভীরে। ফ্রেম করে গাছ রাখতে পারেন। আবার শুধু মেঝেতেও রাখতে পারেন টবের গাছগুলো। গাছ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে গাছের আকার নিয়ে ভাবুন। ছোট ও মাঝারি আকারের গাছ বেছে নিন। ফুলের গাছ লাগাতে চেষ্টা করুন বেশ কয়েকটি। এতে বারান্দার সৌন্দর্য বাড়বে। একই সঙ্গে আপনার মনে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে রঙিন তাজা ফুল। তবে একটি বিষয় মনে রাখবেন; গাছ যদি স্থান পায় আপনার বারান্দায়, তাহলে স্থান দিতে হবে মনেও। চাই গাছের প্রতি প্রচণ্ড মমতা। নিয়মিত যত্ন নিন। পানি গাছের জন্য খুব জরুরি। পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝাঁঝরি ব্যবহার করুন। এতে সব গাছ সমানভাবে পানি পাবে। পাতা পোকায় আক্রান্ত হলে বিশেষজ্ঞ মতামত নিন। টবের নিচে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, গাছের চাহিদা বুঝে যত্ন নেওয়া।