এক অসহায় মায়ের লড়াই

'খুনিদের বিচার চাই'

চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ হত্যা

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সারোয়ার সুমন ও সৌভাগ্য বড়ূয়া, চট্টগ্রাম

'খুনিদের বিচার চাই'

ঘড়ির কাঁটা অনুসারে :ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জয় বাংলা ভাস্কর্যের সামনে অবস্থানের সময় বৃষ্টিতে ভিজছেন মা জাহেদা আমিন চৌধুরী; পুলিশের আশ্বাসে অনশন ভাঙার পর চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা এবং খুনিদের গ্রেফতার দাবিতে কাফনের কাপড় পরে শহীদ মিনারের সামনে মায়ের অনশন - সমকাল

জাহেদা আমিন চৌধুরী। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের প্রয়াত সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর মা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) উচ্চমান সহকারী পদে কর্মরত তিনি। সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ক্যাম্পাসে দেখলেন প্রকাশ্যে হাঁটছে দিয়াজ হত্যা মামলার আসামিরা। এরপর অফিসে না গিয়ে কিনলেন কাফনের কাপড়। সেই কাপড়ে লিখলেন মামলার আসামিদের নাম। এরপর গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চত্বরে। শুরু করলেন আমৃত্যু অনশন। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নেওয়া হয় চবি মেডিকেল সেন্টারে। কিন্তু সেখান থেকে পালিয়ে আবার চবির শহীদ মিনারের সামনে গায়ে কাফন জড়িয়ে ছেলে হত্যার আসামিদের গ্রেফতার দাবিতে অনশন শুরু করেন তিনি। পাঁচ ঘণ্টা পর ফের অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকে নিয়ে যান বাসায়। ঘটনাটি ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বরের। এর আগে একই বছরের ৮ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট এলাকায় ছেলের রক্তাক্ত ছবি নিয়ে দাঁড়ান জাহেদা আমিন। খুনিদের গ্রেফতার দাবিতে প্রতিবাদ করেন একা একা। ২০১৮ সালেও সরব ছিলেন তিনি। গত ৩১ অক্টোবর ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে 'জয় বাংলা চত্বরে' পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। তবে প্রতিবাদী এক মায়ের এমন অশ্রুভেজা আকুতিতেও মিলছে না দিয়াজ হত্যার বিচার। গ্রেফতার হচ্ছে না আসামিরা। কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না মামলার তদন্তও। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ(সিআইডি)।

সিআইডি চট্টগ্রামের সহকারী পুলিশ সুপার মো. জসীম উদ্দিন খান সমকালকে বলেন, 'মামলাটির তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এক আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও বর্তমানে সে জামিনে আছে।'

তাই বলে হাল ছাড়ছেন না জাহেদা আমিন চৌধুরী। ছেলে হত্যার বিচার দাবিতে অনড় রয়েছেন। তিনি বলেন, ছেলের কবরের মাটি ছুঁয়ে শপথ করেছি। তার খুনিদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত পিছু হটব না। অনেক হুমকি আসছে, এসবের পরোয়া করি না। যারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তাদেরও শেষ রক্ষা হবে না। খুনিদের বিচার দাবিতে চবি ক্যাম্পাস ছেড়ে প্রয়োজনে শহরে গিয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে, শহীদ মিনারের সামনে প্রতিবাদ করবেন বলেও জানান তিনি।

২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর রাতে চবির দুই নম্বর গেট এলাকায় ভাড়া বাসার নিজ কক্ষ থেকে দিয়াজ ইরফানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথম ময়নাতদন্তে এটিকে আত্মহত্যা বলা হয়। কিন্তু এ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনকে আসামি করে মামলা করেন দিয়াজের মা। আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয়বার করা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দিয়াজকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক দিয়াজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন।

দিয়াজ হত্যাকাণ্ডটি পুনরায় আলোচনায় আসে গত বুধবার। এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে একটি ম্যাগাজিনে মামলার এক আসামির ছবি দেখে কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন জাহেদা আমিন। এ প্রসঙ্গে দিয়াজের বড় বোন অ্যাডভোকেট জুবাঈদা ছরওয়ার চৌধুরী নিপা সমকালকে বলেন, দিয়াজকে খুব ভালবাসতেন মা। তার এভাবে চলে যাওয়া কোনোভাবেই মানতে পারছেন না তিনি। আসামিদের প্রকাশ্যে দেখলেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারেন না। সর্বশেষ চবি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী সমিতির বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা উপলক্ষে প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিনে দিয়াজ হত্যা মামলার আসামি আলমগীর টিপুর ছবিসহ শুভেচ্ছা বার্তা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। নিপা বলেন, এর আগেও খুনিদের দেখে কাফনের কাপড় পরে এবং অনশন করে একা একা প্রতিবাদ করেছেন তার মা। তারপরও আসামিরা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করায় হতাশা বাড়ছে তাদের।

দিয়াজের মৃত্যুর ঘটনায় ২০১৬ সালের ২৪ নভেম্বর জাহেদা আমিন চৌধুরী আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি গ্রহণ করে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। মামলার আসামিরা ছিলেন- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেন, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবুল মনসুর জামশেদ, চবি ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির তৎকালীন সভাপতি আলমগীর টিপু, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা রাশেদুল আলম জিশান, আবু তোরাব পরশ, মনসুর আলম, আবদুল মালেক, মিজানুর রহমান, আরিফুল হক অপু ও মোহাম্মদ আরমান। তাদের মধ্যে কেবল আনোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করা হলেও এখন তিনি জামিনে আছেন।

যে কারণে থমকে আছে বিচার

চবিতে আছে ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপ। এর একটি প্রয়াত সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। তার মৃত্যুর পর এ গ্রুপের হাল ধরেছেন তার ছেলে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। অন্যদিকে আরেকটি গ্রুপ চট্টগ্রামের বর্তমান সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরের অনুসারী হয়ে কাজ করছে ক্যাম্পাসে। দিয়াজ ছিলেন আ জ ম নাছিরের অনুসারী। আর তাকে হত্যার দায়ে যারা আসামি হয়েছেন তারাও আ জ ম নাছিরের অনুসারী। চবির ছাত্রনেতারা এভাবে 'বড় নেতাদের' আশ্রয়ে থাকায় দিয়াজ হত্যার বিচার দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে মনে করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। চবি শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, লাশ নিয়েও রাজনীতি হয় চবিতে। এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন খুন হয়েছেন। এখানে রাজনীতির নামে চলে টেন্ডার বাণিজ্য। এ বাণিজ্যের ভাগ যায় অনেক ওপরে। তাই হয়তো লাশ পড়লেও বিচার হয় না চবিতে।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৫ কোটি টাকার দরপত্রের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের কারণেই দিয়াজকে খুন করা হয়েছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একাংশ অভিযোগ তুলেছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের দরপত্র ছিল ৭৫ কোটি টাকার। আর জননেত্রী শেখ হাসিনা হলের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের দরপত্র ছিল ২০ কোটি টাকার। এসব টেন্ডারে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রলীগের একাধিক গ্রুপ-উপগ্রুপ। এরই নির্মম বলি হয়েছেন দিয়াজ- এমনটাই মনে করছেন অনেকে। তবে দিয়াজের পরিবার মনে করে, ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য বিস্তার করতেই প্রতিবাদী যুবক দিয়াজকে হত্যা করে প্রতিপক্ষ।