শরণার্থীর চাপে পিষ্ট তুরস্ক

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬      

সমকাল ডেস্ক

বৃদ্ধ জামালের হাতে একটা জীর্ণ কাগজ। কাগজটায় ১৩টা মুখের ছবি। এরা সবাই তার পরিবারের সদস্য এবং এখন মৃত। সিরিয়া থেকে এই কুর্দি পরিবারটি তুরস্কে পালিয়ে এসেছিল জীবন বাঁচানোর তাগিদে। সেখান থেকে ইউরোপের উদ্দেশে গ্রিসে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন জামালের পরিবারের এই ১৩ সদস্য।
'এটা আমার স্ত্রী'- ছবির সবচেয়ে বয়স্ক মুখটার ওপর আঙুল রেখে বললেন জামাল। 'নিজাহ আকলি। এটা ছেলের বউ শেরিন মুজাফার। এ দু'জন নাতি। একজনের নাম মা'সুম আরেক জন মুহামেত।'
সকাল ৮টার দিকে একটা যন্ত্রচালিত নৌযানে চড়ে তুরস্ক থেকে গ্রিসে যাচ্ছিল পরিবারটি। তুরস্কের জলসীমার মাত্র অর্ধেক পেরিয়েছে, ঠিক এ সময় নৌকাটি ডুবে যায়। জেলেরা যখন জামালকে উদ্ধার করেন, তখন প্রায় ৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। নারী ও শিশুরা পানিতে তলিয়ে যায়। তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। বৃদ্ধ জামালের সঙ্গী এখন হাতের ওই তেল চিটচিটে কাগজে ছাপা মুখগুলোই, যেসব মুখ চিরতরে হারিয়ে গেছে আশ্রয়ের সন্ধানে হন্যে হয়ে দেশে-বিদেশে ঘোরার যন্ত্রণাকে পেছনে ফেলে।
এই বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটেছিল তিন মাস আগে। এর পর থেকে এ রকম ঘটনা আরও ঘটেছে। তুরস্ক এমন এক দেশ, ইউরোপে যেতে হলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের তার ওপর দিয়েই যেতে হয়। সুতরাং উদ্বাস্তুদের চাপ প্রথমে সইতে হয় তাদেরই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতে, শরণার্থী সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তুরস্ককে বিবেচনায় না এনে পারা যায় না।
তাহলে শরণার্থীদের প্রথম চাপটা কীভাবে সামলাতে হয় ইউরোপের এই একমাত্র মুসলিমপ্রধান দেশটিকে? কতটা চাপ ফেলছে এই 'উটকো' ঝামেলা তুরস্কের অর্থনীতিতে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধারণা, তারা যদি নৌকাযোগে গ্রিস শরণার্থী আসা ঠেকাতে পারে, তাহলে সিরিয়া থেকে আসা মানুষের ঢল তুরস্কেই থামবে। কিন্তু কথা হলো, তুরস্কের পক্ষে কতটা সম্ভব শরণার্থীর চাপ সামাল দেওয়া? জামালের মতো মানুষদের কাছে সিরিয়া এখন মৃত্যুপুরী। নিজেদের জীবনের সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্র আর খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। বললেন, 'সিরিয়া ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা তুরস্কেও টিকতে পারছি না। একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া করেছি মাসে ৩০০ ডলারে। আমাদের ছেলেেেময়েরা এখানে বন্দি হয়ে আছে অভাব-অনটন আর বিধিনিষেধের ঘেরাটোপে। আমরা তাদের লেখাপড়া শেখার জন্য স্কুলেও পাঠাতে পারছি না। আর এখানে দ্রব্যমূল্য আমাদের মতো মানুষের জন্য আকাশচুম্বী।'
তাদের মতে, ইউরোপই ভালো। কারণ ইউরোপীয়রা এশীয়দের মতো নয়; তারা উদার। তাদের মনে মায়া-মমতা আছে।
তুরস্কের পক্ষে কতটা সম্ভব? : গ্রিক দ্বীপ লেসবস হলো ইউরোপের প্রবেশদ্বার। তুরস্ক থেকে গ্রিসের লেসবস হয়েই ইউরোপের ভূমিতে পা রাখেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। তার আগে তুরস্ককেই সবার আগে ধকলটা সইতে হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও চায়, তুরস্ক ওই চাপটা সামলাক। কিন্তু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসিপ তাইয়েপ এরদোগান বলেন, আমাদের যেন গর্দভ হিসেবে ট্রিট করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৩০০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা বলেছিল; তার কোনো খবর নেই। বিরক্ত এরদোগান অনেকটা চরমপত্র দেওয়ার মতো বলেছেন, যদি প্রতিশ্রুতি পূরণ করা না হয়, তাহলে তিনি শরণার্থীদের প্লেন ও বাসভর্তি করে ইউরোপে পাঠিয়ে দেবেন। একা তুরস্কের পক্ষে এই মহাভার বহন করা কখনোই সম্ভব হবে না বলে জানিয়ে দেন তিনি। আসলে তুরস্কের নিজেরও সমস্যার অন্ত নেই। তাদের সামলাতে হচ্ছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর থেকে রুশ নিষেধাজ্ঞাও তাদের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব সার্জারির অধ্যাপক চেম তারজি বলেন, 'একটা দেশের পক্ষে একই সময়ে ত্রিশ লাখ অতিরিক্ত মানুষের চাপ সহ্য করাটা দুষ্কর। বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা যদি তাদের সাহায্যে একযোগে এগিয়ে না আসে, তাহলে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসাটাই স্বাভাবিক।'
ইইউ-তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক মার্চে : শরণার্থী সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে এক সম্মেলনে বসতে যাচ্ছে তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আগামী মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহেই এ বিষয়ে কথা হবে দু'পক্ষের মধ্যে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, বৈঠকে শরণার্থী বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা নিয়েই আলাপ হবে। আলাপে তুরস্কের সীমান্তে শরণার্থীদের জন্য বাড়িঘর নির্মাণে তুরস্ককে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার ব্যাপারকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
৯০০ শরণার্থী উদ্ধার : গ্রিস দ্বীপ লেসবসের কাছ থেকে ৯০০ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স। লেসবসের পোর্ট অব মাইটিলেন ও তুর্কি উপকূলের মাঝখান দিয়ে একটি জাহাজে বুলগেরিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়ার পথে রক্ষীরা তাদের উদ্ধার করে। ফ্রন্টেক্স জানায়, তারা সব যাত্রীকে সাগরে যাওয়া থেকে বিরত রাখে। কারণ এখন শীতকালে সমুদ্রপথ উত্তাল। বৃহস্পতিবার টুইটারে ফ্রন্টেক্স এ তথ্য জানায়। সূত্র :বিবিসি, এএফপি।