সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা মোদির নির্বাচনী কৌশল!

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

সমকাল ডেস্ক

ভারতে সারাক্ষণই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চলছে। তবে তা ব্যাপক আকার ধারণ করছে না এখনও। গরু রক্ষার নামে পিটিয়ে মানুষ হত্যাসহ বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে এখানে-সেখানে। সেখানে উস্কানিদাতা হিসেবে বিজেপি নেতাদের নাম এসেছে। তাজমহল, কুতুব মিনার নিয়ে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য ফের নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এসব কিছু পরিকল্পনা মাফিক হচ্ছে কি-না। সোজা কথায়, ভারতের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কি মোদির নির্বাচনী পরিকল্পনার অংশ? সম্প্রতি ভারতীয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকার বিশ্নেষণে উঠে এসেছে এমন সব কথা। ভারতের সাম্প্র্রতিক সাম্প্র্রদায়িক উত্তেজনায় ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে জোরেশোরে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় রামনবমীর মিছিলকে ব্যবহারের কথা উঠে এসেছে ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। এ ধরনের মিছিলের সংখ্যা বাড়ছে এবং বিজেপি মিছিলগুলোকে সাম্প্র্রদায়িক উস্কানি সৃষ্টিতে ব্যবহার করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিহার রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী অশ্বিনী কুমার চৌবের ছেলে অরিজিৎ শাশ্বত। দু'দিন আগেই গ্রেফতার হয়েছেন আরও ১০ বিজেপি নেতা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন বিশ্নেষণাত্মক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সাম্প্র্রদায়িক উস্কানির মধ্য দিয়ে সংঘাত সৃষ্টি করে হিন্দু ভোটারদের দলে ভেড়ানোর পাঁয়তারা করছে বিজেপি। ইন্ডিয়া টুডের সাম্প্র্রতিক এক প্রতিবেদনে বিগত তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্র্রদায়িক সংঘাত বৃদ্ধির আলামত মিলেছে। বিশ্নেষকরা বলেছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখেই সংখ্যালঘুদের বিপরীতে হিন্দু ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করে নিজেদের দলে টানার এই প্রচেষ্টা নিয়েছে বিজেপি।

ইন্ডিয়া টুডের এক পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দিন দিন সাম্প্র্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে।

দ্য হিন্দুর ৩১ মার্চের সম্পাদকীয় ভাষ্যে বলা হয়েছে, রানীগঞ্জ-আসানসোল শিল্পাঞ্চলে এ ধরনের সংঘাত অপ্রত্যাশিত। গত তিন বছরে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্র্রদায়িক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিহারের সাম্প্র্রদায়িক সহিংসতা এমন সময় হলো, যখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স সর্বশেষ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। পুরো উত্তর ভারতজুড়ে প্রতিদিন সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু সম্প্র্রদায়ের মধ্যে সহিংসতার সম্ভাব্যতা বাড়ছে। তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে এ প্রবণতা। সংঘ পরিবার এ ঘটনায় একেবারে দায় অস্বীকার করতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে রামনবমী ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান নতুন কারণ হিসেবে সামনে আসছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন রাজনৈতিক হাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত দায়িত্ব আরও বাড়ছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রামনবমী উপলক্ষে ১৭ মার্চ বিহারের ভাগলপুর শহরে একটি মিছিলের অনুমতি নেওয়া হলেও মুসলিম অধ্যুষিত স্থানগুলোতে ওই মিছিল থেকে সাম্প্র্রদায়িক উস্কানি ছড়ানো হচ্ছিল। 'ভারতীয় নববর্ষ জাগরণ সমিতি' নামে এক সংগঠনের ব্যানারে অনুষ্ঠিত ওই মোটরবাইক মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী অশ্বিনী কুমার চৌবের ছেলে অরিজিৎ শাশ্বত। ডয়েচে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিহারের এক টিভি চ্যানেলের প্রবীণ সাংবাদিক কুন্দন সিং বলেছেন, 'মন্ত্রীর ছেলের উস্কানিমূলক ভাষণের পর থেকেই হিংসা শুরু হয়েছিল।' স্ট্ক্রল.ইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রভাব বিস্তারে বিজেপি রামনবমীকে ব্যবহার করছে। এতে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে রামনবমীর মিছিলের সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর রাজ্যজুড়ে ২০০টির বেশি মিছিল বের করা হয় যাতে 'হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ' হওয়ার আহ্বান জানানো হয় 'জিহাদি কর্মকাে র বিরুদ্ধে'। মিছিলগুলো ধর্মীয় হলেও বিজেপির পৃষ্ঠপোষকতাতেই এসব মিছিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল গেলেও মন্ত্রী মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলো এড়িয়ে চলে এসেছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার কারণ জানা যাবে সরকারি তদন্তে। কিন্তু ধর্মীয় আচার কয়েকটি রাজ্যে বিভাজন সৃষ্টির কারণ হয়ে উঠেছে। রাজস্থানের যোধপুর জেলায় রামনবমীতে শম্ভু লালকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। যে ব্যক্তি মুসলিমবিরোধী সংঘাতে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা ও ভিডিও ধারণ করায় কারাগারে রয়েছে। মার্চেই বিহারের ভাগলপুরে সংঘ পরিবার গোষ্ঠীর আয়োজিত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে সাম্প্র্রদায়িক উস্কানি দেওয়া হয়। সেখানে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী চৌবের ছেলে অরিজিৎ শাশ্বতের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে (১ এপ্রিল অরিজিৎ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন)। রামনবমীর পর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে বিহারের আওরঙ্গবাদ, সামাস্তিপুর ও নাওয়াদাতে।

আউটলুক ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা ৩৩ শতাংশ। ফলে বিজেপি ক্ষমতায় যেতে বাধার মুখে পড়ছে। ফলে কৌশলটা হলো পুরো হিন্দু ভোটারদের দলের পতাকায় ঐক্যবদ্ধ করা।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানী অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর পর্যালোচনা অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ভোটাররা ঐক্যবদ্ধ নয়। কারণ এখানকার হিন্দুরা ধর্মের ভিত্তিতে নয়, আদর্শের ভিত্তিতে ভোট দেয়। ফলে বিজেপি চেষ্টা করছে হিন্দুত্ববাদকে উস্কে দিয়ে হিন্দুদের ভোট পেতে।