বাণিজ্যযুদ্ধে জিতবে কে

বিশ্নেষণ: যুক্তরাষ্ট্র-চীন

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

সমকাল ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ আরেক দফা তীব্র হলো। পরস্পরের পণ্য রফতানির ওপর পাল্টাপাল্টি কর আরোপের প্রতিযোগিতায় নেমেছে দেশ দুটি। বিশ্ববাণিজ্যে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কানাডা, মেক্সিকোসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে? বা কোন দেশের কতটা ক্ষতি হবে? এ বিষয়ে পর্যবেক্ষকরাও এখন নানা ধরনের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করে আসছেন, চীনের কাছে বাজার খুলে দিয়ে তার দেশ ব্যাপক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। তার প্রশাসন হিসাব কষে দেখিয়েছে, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৮০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এই ঘাটতির প্রধান কারণ, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যহীনতা। ট্রাম্পের দাবি, এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চাকরি হারিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। অভিযোগ জানানোর মধ্যেই সীমিত থাকেননি ট্রাম্প। মার্চের শেষ দিকে অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাতসহ শত শত চীনা পণ্যের ওপর তিনি শুল্ক্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ওইসব পণ্যের আমদানিমূল্য প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলার। এর জবাবে গত সোমবার চীনও পাল্টা জবাব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা মদ, শূকরের মাংস, ফলসহ ১০৬টি পণ্যের ওপর তিনশ' কোটি ডলারের আমদানি শুল্ক্ক বসিয়েছে দেশটি।

বেইজিংয়ের এ পাল্টা পদক্ষেপকে 'অন্যায্য' অ্যাখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, নিজেদের ভুল না শুধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক ও কারিগরদের ক্ষতি করার পথ বেছে নিয়েছে চীন। ট্রাম্প আরও বলেন, 'চীনের এ অন্যায্য পদক্ষেপের পর আমি দেশটির ওপর আরও ১০ হাজার ডলার শুল্ক্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছি। কোন কোন পণ্যের ওপর শুল্ক্ক দেওয়া যায়, তা চিহ্নিত করার কথাও বলেছি।' এর আগেই চীনের বিমান, তথ্যপ্রযুক্তি, মোটরসাইকেল, চিকিৎসা সামগ্রীসহ ১৩শ' পণ্যের ওপর নতুন করে কর আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানায় ট্রাম্পের প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে চীনের বিরুদ্ধে আরও ১০ হাজার কোটি ডলার শুল্ক্ক আরোপের প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া হয়েছে। এটা কার্যকর হলে চীনের বিরুদ্ধে আরোপিত শুল্ক্কের পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়াবে।

চীনও ফের পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কথা হলো, নিজের স্বার্থ সুরক্ষায় মূল্য যত চড়াই হোক, তা দিতে প্রস্তুত বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ট্রাম্পকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, শুল্ক্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র বড় ভুল কাজ করেছে। চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী গাও ফেং বেশ ক্ষুব্ধ কণ্ঠেই বলেছেন, আমরা বাণিজ্যযুদ্ধ চাই না। তবে বাণিজ্যযুদ্ধকে আমরা ভয়ও পাই না। যুক্তরাষ্ট্র যদি একতরফাভাবে তাদের রক্ষণশীল পদক্ষেপ বাণিজ্যের ঘাড়ে চাপাতে থাকে, চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।

বিশ্বের এক নম্বর এবং দুই নম্বর অর্থনীতির দেশের মধ্যে এই বাণিজ্যযুদ্ধের পরিণতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। বিশ্নেষকরা মনে করেন, বিশ্ববাজারের জন্য এ যুদ্ধ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে পর্দার আড়ালে বৈঠকে বসা জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে এমন আশঙ্কাকে একদমই পাত্তা দিচ্ছেন না ট্রাম্প। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, বাণিজ্যযুদ্ধ ভালো এবং যুক্তরাষ্ট্রের এতে কোনো ক্ষতি হবে না, বরং লাভ হবে। হোয়াইট হাউস জানায়, মেধাস্বত্ব অধিকার বিষয়ে চীনের অন্যায্য চর্চার কারণেই আমদানি পণ্যে এ অতিরিক্ত শুল্ক্কের প্রস্তাব করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও ট্রাম্পের দাবি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে প্রযুক্তি ভাগাভাগিতে চাপ দিচ্ছে চীন।

বিশ্নেষকরা অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন, এ যুদ্ধে কি সত্যিই তিনি জিতবেন? অধিকাংশ বিশ্নেষকেরই ধারণা, এ লড়াই কোনো পক্ষই জিতবে না। বিশ্নেষকরা এর সপক্ষে বেশ কিছু কারণ তুলে ধরেছেন।

ইস্পাত খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ততটা বাড়বে না :ট্রাম্প মনে করেন, শুল্ক্ক বসালেই যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল এবং অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে। বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ। তবে বিশ্নেষকরা মনে করেন, তা নাও হতে পারে। কারণ, ইতিহাস বলে, অতীতে বহুবার ইস্পাত শিল্পকে এভাবে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এর কারণ প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ইস্পাত শিল্পে শ্রমিকের চাহিদা দিন দিন কমছে। ২০০২ সালে একটি গবেষণা সংস্থার হিসাবেও এর সমর্থন মেলে। তাদের মতে, ইস্পাত আমদানির ওপর আমদানি কর বসালে বড়জোর সাড়ে তিন হাজার মানুষের চাকরি বাঁচবে।

নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ইস্পাতনির্ভর শিল্পে :বাড়তি শুল্ক্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ইস্পাতনির্ভর বিভিন্ন শিল্পে। যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত শিল্পে বর্তমানে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজার। কিন্তু অন্য যেসব শিল্প ইস্পাতের ওপর নির্ভর করে সেগুলোতে শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। ফলে, বোধগম্য কারণেই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছে ইস্পাতনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। খুচরা বিক্রেতাদের সমিতি অভিযোগ করেছে, ট্রাম্প আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপরই কর বসাচ্ছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত হবে মিত্ররা :ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলো। তারাও ট্রাম্পের পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ইস্পাত আমদানি করে কানাডা থেকে। তারপর ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মেক্সিকো থেকে। এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক এবং সামরিক মিত্র। ফলে ইস্পাতের ওপর শুল্ক্ক বসালে এরা ক্ষেপে যাবে। আগামী দিনগুলোতে হয়তো দেখা যাবে, কানাডা বা ইউরোপ এই বাড়তি শুল্ক্ক থেকে অব্যাহতি চাইবে। না পেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ট্রাম্প মনে করেন, মিত্র দেশগুলোর মাধ্যমে আসলে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সস্তা ইস্পাত ঢোকাচ্ছে, ফলে তাদের ওপরও শুল্ক্ক না চাপিয়ে উপায় নেই।

ক্ষতিগ্রস্ত হবেন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা :যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের বড় গ্রাহক চীন। বেইজিংয়ের শুল্ক্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

পাল্টা ব্যবস্থা নেবে চীন :চীনের হাতে পাল্টা অস্ত্র আছে সেটাও ট্রাম্পকে ভুললে চলবে না। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও কৃষিশিল্পের মতো যেসব পণ্য চীনে বাজার পাচ্ছে বা চায়, তারা এই লড়াইয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বিরুদ্ধে এক দফা শুল্ক্কারোপ করেছে চীন। তারা ভয় পাচ্ছে, চীন আবারও পাল্টা পদক্ষেপ নেবে। গত সোমবার মদ, শূকরের মাংসসহ যুক্তরাষ্ট্রের ১০৬টির মতো পণ্যের ওপর শুল্ক্ক বসিয়েছে চীন।