প্রাণের ডাকে মেলায়

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

বিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির মতে, আমার মধ্যে উত্তম বলে যদি কিছু থাকে তার জন্য আমি বইয়ের কাছে ঋণী। বই জ্ঞানের প্রতীক। নিঃস্বার্থ বন্ধুর প্রতীক। জীবনের প্রিয় বন্ধুর তালিকায় বইয়ের অবস্থান সবার উপরে। বই মানুষকে দেয় উদার হওয়ার শিক্ষা, শেখায় ভালোবাসতে। সত্য সুন্দর আনন্দময় অনুভূতিতে মনকে আলোড়িত করে তোলে বই। স্মরণীয় প্রকাশক 'মুক্তধারার' চিত্ত সাহা খুব ছোট আকারে, এককভাবে এই মেলার সূচনা করার পর থেকে বেশ দ্রুতই বইমেলা এক জাতীয় উৎসব হিসেবে বিকশিত হয়েছে। অমর একুশে গ্রন্থমেলার শুরু ১৯৭২ সালে মুক্তধারার প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরে। ওই বছর বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনে চট বিছিয়ে কয়েকটি বই নিয়ে বসেছিলেন তিনি। পরের বছরগুলোতে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও কয়েকজন প্রকাশক। ১৯৮৪ সালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এই মেলা। তখন থেকেই বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে আয়োজিত হয়ে আসছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। ওই সময় ৫০-৬০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিত এই আয়োজনে।

সময়ের পরিক্রমায় সেই মেলা এখন পরিণত হয়েছে জাতীয় উৎসবে। বাংলা একাডেমি চত্বরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় গত চার বছর ধরে মেলার পরিধি বাড়ানো হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অমর একুশে গ্রন্থমেলা সবার কাছে বইমেলা নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। লেখক-প্রকাশকরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ও পাঠক। দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ওই সময়ের জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। এই সময়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও বেড়েছে। কিন্তু ৩৫-৪০ বছর আগে যে প্রত্যাশা নিয়ে বইমেলার শুরু, তা শতভাগ পূরণ হয়নি বলে মনে করেন তারা। তাদের মতে, আগে বইমেলার যে গাম্ভীর্য ছিল তা এখন কমে এসেছে। গত কয়েক বছরে বইমেলা ঘুরে দেখা গেছে, অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিণত হয়েছে উৎসবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বইমেলায় থাকে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। পহেলা ফাল্কগ্দুন, ভালোবাসা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারির মতো দিনগুলোতে এই ভিড় পরিণত হয় জনসমুদ্রে। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সী নারী-পুরুষ উপস্থিত হয় মেলায়। অনেকেই আসেন সপরিবারে। অনেক লেখক ও প্রকাশকের মতে, 'বইমেলাতেই বই প্রকাশ করতে হবে- এমন একটি মানসিকতা গড়ে উঠেছে। প্রকাশকরাও বিনামূল্যে প্রচারের সুযোগে এই মানসিকতাতে সায় দিয়ে থাকেন। এতে প্রকাশক, প্রকাশিত বই ও পাঠকের সংখ্যা বেড়েছে। তবে প্রকৃত পাঠকের সংখ্যা ততটা বাড়েনি।' গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বইমেলায় প্রতি বছর তিন থেকে চার হাজার নতুন বই ছাপা হচ্ছে।

এবারের মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য এরই মধ্যে ৫৫০টি প্রকাশনা সংস্থা ও সংগঠনকে নির্বাচিত করেছে এর আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। এগুলোর মধ্যে প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা প্রায় ৫০০। গতবারের তুলনায় এবারের মেলায় অংশ নিতে যাচ্ছে ৪৫টির বেশি প্রকাশনা সংস্থা।

ক্রমে বিকশিত হচ্ছে প্রকাশনা শিল্প। সেই সঙ্গে প্রকাশকের সংখ্যাও বাড়ছে প্রতি বছর। তবে অনেক প্রকাশক, লেখক ও পাঠক বইমেলা নিয়ে বেশ আশাবাদী। তাদের মতে, 'ক্রমান্বয়ে বইয়ের কাটতি বেড়েছে। সৃজনশীল বা মননশীল বইয়ের বাজার আরও বাড়বে। এটা সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।' এ ছাড়া, এখনকার মেলায় আন্তর্জাতিক ছাপ রয়েছে।



লেখা : গোলাম কিবরিয়া

ছবি :মাহবুব হোসেন নবীন