'ঢাকা ক্লিন'-এর অভিযান

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০১৬      

ছুটির দিনগুলোতে দলবেঁধে একদল তরুণ-তরুণী ঝাড়ূ হাতে নেমে পড়ে ঢাকার ব্যস্ত রাজপথে। রাস্তায়, ফুটপাতে এবং যে কোনো ব্যস্ত এলাকায় জমে থাকা ময়লা ঝাড়ূ দিয়ে মুহূর্তেই ঝাঁ চকচকে ওই এলাকা। নিজের দেশ এবং শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে এই তরুণ দল একত্রিত হয়েছে 'ঢাকা ক্লিন' নামে এ

বায়ান্নতে বাস্তবায়ন করেছি 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা'। একাত্তরে বাস্তবায়ন করেছি 'স্বাধীন বাংলাদেশ'। এবার বাস্তবায়ন করব 'পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশের স্বপ্ন'- এমন একটা স্বপ্নকে পুঁজি করেই 'ঢাকা ক্লিন-এর অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল। জনসংখ্যার চাপ আর অব্যবস্থাপনা-অসচেতনতায় দিনে দিনে আমাদের প্রিয় শহর ঢাকায় যে তীব্র অপরিচ্ছন্নতা তৈরি হচ্ছে, নগরবাসীকে সেই অপরিচ্ছন্নতা থেকে মুক্তি দিতে ঢাকা শহরকে একটি সুন্দর পরিষ্কার শহর হিসেবে গড়ে তোলার সদিচ্ছা নিয়ে কাজ শুরু করেছে 'ঢাকা ক্লিন' নামে এ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি। প্রত্যেকটি অভিযানে দেখা যাবে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের বিভিন্ন বয়সের মানুষ একসঙ্গে পরিষ্কার করছে আপনার-আমার আশপাশেরই কোনো জায়গা। কারও হাতে ঝাড়ু, কারও হাতে বেলচা- এমন নানা সরঞ্জাম নিয়ে গ্গ্নাভস হাতে নেমে পড়ছে বাংলাদেশ পরিচ্ছন্নতার স্বপ্নে। প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়। একেক সপ্তাহে একেকটি পরিচ্ছন্নতার টার্গেট পরিপূর্ণ করে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আত্মপ্রত্যয়কে আরও সুসংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছে এ সংগঠনটি। প্রমাণ করেছে, সদিচ্ছা আর দেশের প্রতি, নিজের সমাজের প্রতি ভালোবাসা থাকলে সব সম্ভব।
ঢাকা ক্লিন একটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সোনার বাংলা তৈরির আন্দোলনের নাম। যার উদ্দ্যেশ্য বাংলাদেশকে একটি সুন্দর, ময়লা-আবর্জনামুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করা।
মুখের কথায় নয়, বরং প্রতিনিয়ত কাজের মধ্যেই ঢাকা ক্লিনের পরিচয়। তবে ঢাকা ক্লিনের কাজ শুধু পরিষ্কার অভিযান পরিচালনা নয়, সঙ্গে সঙ্গে জনসচেতনতা তৈরি করা। যেন জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি পরিষ্কার দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়।
সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে পরিচালিত এ সংগঠনে প্রতি সপ্তাহেই বাড়ছে স্বেচ্ছাসেবী দেশপ্রেমী সদস্যের সংখ্যা। তবে এখন পর্যন্ত সংগঠনের মূল অর্থের জোগান দিয়ে যাচ্ছেন 'ঢাকা ক্লিন' স্বপ্নের মূল প্রস্তাবক ফরিদ উদ্দিন মিলন। ঢাকা ক্লিন পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশাজীবী, ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম কর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শ্রমজীবী মানুষ- যারা এই ঢাকা ক্লিন স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য কায়িক পরিশ্রম থেকে শুরু করে সাধ্যমতো আর্থিক জোগান দিয়ে কাজটাকে বেগবান করতে বদ্ধপরিকর।
ব্যক্তিগত এবং ফেসবুক যোগাযোগের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এ সংগঠনটির পরিকল্পনা পর্যালোচনা করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, ঢাকা ক্লিন সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে চালিত একটি অলাভজনক সচেতনতা সৃষ্টিমূলক সামাজিক সংগঠন। ঢাকা ক্লিন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি বাংলাদেশকে তার সমহিমায় উজ্জ্বল দেখতে চায়। যার আলোকে প্রথমে ঢাকায় কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে তারা বিভাগীয় শহরগুলো পরিষ্কার করার কাজেও হাত দিয়েছে। বরিশাল, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জায়গায় ইতিপূর্বে কাজ হয়েছে। এখন পরিকল্পনামাফিক একের পর এক বিভাগ ও জেলা শহরে কাজ করার চিন্তা করছে সংগঠনটি। বিভাগগুলো পরিষ্কার হয়ে গেলে ঢাকা ক্লিন প্রত্যেকটা বিভাগের অন্তর্গত জেলা পরিষ্কারে নেমে যাবে বলে তাদের মূল সমন্বয়কারী জানিয়েছেন। আর এভাবেই তারা একটি বাস্তবসম্মত কার্যকরী পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে জেলা শহর থেকে থানা, থানা থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে মহল্লায় বা পাড়ায় পাড়ায় তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে চায়।
'ঢাকা ক্লিন' নাম দেখে শুরুতে প্রশ্ন দানা বাঁধলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা ক্লিন শুধুই একটা নাম। ঢাকা ক্লিন বলতে শুধুই ঢাকা নয়। ঢাকা যেহেতু বাংলাদেশের রাজধানী সেই হিসেবে ঢাকাকে মূল বিন্দু হিসেবে ধরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই মূলত এমন নামকরণ।

ঢাকা ক্লিনের মূল চিন্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং মানুষকে সচেতন করা, যেন একটা ময়লাও বাইরে না ফেলা হয়। আমরা নিজেরা নিজেদের যেভাবে সবসময় পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং দেখতে পছন্দ করি; ঠিক সেইভাবে নিজের দেশকেও যাতে ভাবতে পারি, সে জন্যই এ উদ্যোগ। ঢাকা ক্লিন এখন ঢাকা ক্লিন ঢাকা, ঢাকা ক্লিন বরিশাল, ঢাকা ক্লিন ময়মনসিংহ, ঢাকা ক্লিন খুলনা, ঢাকা ক্লিন রাজশাহী, ঢাকা ক্লিন রংপুর, ঢাকা ক্লিন সিলেট, ঢাকা ক্লিন চট্টগ্রাম নামেও কাজ শুরু করেছে।
সংগঠনটির আহ্বায়ক এবং এ পর্যন্ত প্রধান পৃষ্ঠপোষক হৃদয়বান এবং বিনয়ী মানুষ ফরিদ উদ্দিন মিলনের কাছে এ কাজে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সবাই নিজেদের ঘরবাড়ি সুন্দর করে সাজাই। নিজেরা দামি সাবান দিয়ে গোসল করি, শরীর পরিষ্কার করি। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় বদঅভ্যাস হচ্ছে নিজের বাড়িঘরের ময়লা-আবর্জনা রাস্তায় ও ড্রেনে ফেলি। দোকান, তরকারি ও ফলের আড়ত, মাছ বাজার ও রাস্তায় ভাসমান তরকারি ও ফলের হকারদের ময়লা-আবর্জনা রাস্তায় ও ড্রেনের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখি। শুধু কি তাই? ড্রেনের মধ্যে বালিশ, কাঁথা, ব্যাগ, আম-কাঁঠালের খোসা- এমন অনেক কিছু পড়ে থাকতে দেখি। আমি বহুদিন থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে আসছি। ঢাকা শহরের প্রতিটি অলিগলিতে আমার যাতায়াত আছে। অনেক কিছু চোখে পড়ে। রাস্তায় আমরা বালি এনে রাখি। সে বালি ড্রেনে পড়ে ড্রেন ভরাট হয়। সিটি করপোরেশনকে আমরা শ্বশুরবাড়ি মনে করি। আমরা মনে করি, সব কিছু সিটি করপোরেশন পরিষ্কার করবে; আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই। এখন জরিমানা করলে সবাই মনে করবে_ এই মেয়র ভালো নয়, সুবিধার নয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও সচেতনতায় পিছিয়ে আছে। বাড়ির মালিক, ভাড়া ঘরের মালিক, দোকানদার সবাই যদি একটি ড্রাম কিনে নিজ নিজ স্থাপনার সামনে রেখে ময়লা-আবর্জনা ড্রামে রাখেন তো অসুবিধা কোথায়? শিক্ষিত লোকদের এসব কথা বলতে হয় না। সমন্বিতভাবে সবাইকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। নিজের দেশেকে পরিষ্কার রাখা যেমন আমাদের নাগরিক দায়িত্ব, তেমনি এ ব্যাপারে নাগরিকদের সচেতনতা সৃষ্টি করাও আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। এভাবে নগরবাসীর মধ্যে এ ব্যাপারে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যে আন্দোলন শুরু করেছে ঢাকা ক্লিন। সিটি করপোরেশনকেও এই ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। কারণ একার পক্ষে একটি সংগঠন পৃষ্ঠপোষক করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। অনেকেই চেষ্টা করে কিছু দূর গিয়েই মুখ থুবড়ে পড়ে। তবে আমরা এগিয়ে যেতে চাই। ভবিষ্যৎ সুন্দর বাংলাদেশই আমাদের স্বপ্ন।
সত্যিই তাই। নিজের শোবার ঘর বা পড়ার টেবিল যতটা যত্ন করে গুছিয়ে রাখি, বাড়ির সামনের রাস্তাটি কি তার অর্ধেক গুরুত্বের সঙ্গেও পরিচ্ছন্ন রাখি? খুব অবাক করা প্রশ্ন, না? আপনার শোবার ঘরের সঙ্গে রাস্তার তুলনা? কথা বলতে চাচ্ছি আমাদের দেশের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। তবে এ রকম চিন্তা-ভাবনা নিয়ে চলতে থাকলে দূর দেশের বিদেশিরা এসে আমাদের দেশ পরিষ্কার করে চোখে আঙুল দিয়ে বারবার বুঝিয়ে দিয়ে যাবে, কত সুন্দর আমাদের এই দেশ! আর আমরা হাত গুটিয়ে দেখব, অবাক হবো। তাই নিজের দেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে অভিযানের পাশাপাশি প্রয়োজন আপনার-আমার সচেতনতা।
তবে একা একটি সংগঠন চাইলেই দেশটা পরিবর্তন হবে না। এই দেশকে পরিবর্তন করতে হলে দরকার ঢাকা ক্লিনের পাশাপাশি আমার-আপনার সবার ব্যক্তিগত মনোভাবের পরিবর্তন। আমরা যদি প্রতিজ্ঞা করি_ আর একটি ময়লাও বাইরে ফেলব না, তবেই সফল করা সম্ভব হবে একটি সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তোলার আন্দোলনকে। তাই ঢাকা ক্লিনের পাশে কাজ করুন অথবা আপনি আপনার নিজ জায়গা থেকে সচেতন হয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলুন। তবেই একদিন বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে এমন একটি দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, যে দেশ সবুজ প্রাকৃতিক মায়ার আধার। রাস্তাঘাট সবই ঝকঝকে তকতকে। কোথাও একবিন্দু ময়লা নেই।