কাগজের কাপে স্বপ্নজয়

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৬      

অফিস, ক্যাম্পাস, রেস্টুরেন্ট কিংবা পার্কে_ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কাপে ভরা আইসক্রিম কিংবা চা-কফি খেয়েছেন অসংখ্যবার। আর অসংখ্যবার কেপিসি পেয়েছে আপনার হাতের ছোঁয়া। দেশি-বিদেশি প্রায় ১৭০টি প্রতিষ্ঠানে নিজের হাতে গড়া কেপিসির পণ্য সরবরাহ করছেন উদ্যমী তরুণ সাজিদ

বাড়ির সঙ্গে আড়ি
দিনমান খেলাধুলায় পড়ে থাকত ডানপিটে ছেলেটা। ফুটবলে স্ট্রাইকার, ক্রিকেটে ওপেনিং ব্যাটসম্যান। ক্লাসে প্রথম স্থান বরাবর তার দখলে। মেধাবী ছেলেটা খুলনা ব্রাদার্সের হয়ে খেলে নিজের নামের সঙ্গে জন্টি রোডস খেতাব জড়িয়ে নেয়। ভালোই দিন যাচ্ছিল। হঠাৎ একদিন কলেজে লাগল গণ্ডগোল। রাজনৈতিক পরিবারের একজনের সঙ্গে মারামারি করে বাড়ির সঙ্গে আড়ি টেনে চলে আসে ঢাকায়। সেটা ১৯৯৭ সালের কথা। ভর্তি হয় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে। মেসে আশ্রয়। টিউশনি করে টেনেটুনে চলে যায় দিন।
এর ভেতর দূরসম্পর্কের এক মামার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। মামা ইলেকট্রিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেন। সেদিকে আগ্রহ জন্মে তার। আরেক মামার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়ে কাজে নেমে পড়ে ছেলেটা। এভাবেই শুরু।
কাগুজে আইডিয়া
মেধাবী ছেলেটা এখন যে প্রতিষ্ঠানে থিতু, তার আইডিয়া আসে ২০১০ সালে। সে বছর নভেম্বরে মাকে নিয়ে হজে যান সাজিদ। হজ শেষে মদিনা শরিফের মসজিদে নববীতে মাগরিবের নামাজ পড়তে যান। সেদিন রোজাও রেখেছিলেন। ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলে একজন তাকে পেপার কাপে কফি আর খেজুর তুলে দেন। নামাজ শেষে খেজুরের কাপটা নিয়ে বাসায় এলেন। রাতে শুয়ে এমন কাগজের কাপ বানানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। হাতের স্মার্টফোনে 'পেপার কাপ' লিখে গুগলে সার্চ দিলেন। তারপর পিছু লেগে থাকা। নভেম্বরের ২১ তারিখ দেশে ফিরে শেয়ার মার্কেটের সব শেয়ার বিক্রি করে দেন সাজিদ। মাথায় শুধুই পেপার কাপ। বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করে জানতে পারেন বিশ্ববাজারে মালয়েশিয়ার মালেক্স কোম্পানির নামডাকের কথা। ভাবলেন এমন একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর কথাও। এর জন্য প্রয়োজন হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ নিতে ২০১১ সালে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দেন সাজিদ। প্রশিক্ষণ নেন দুই মাস।
কেপিসি'র যাত্রা
ফিরে এসে 'লেট দ্য এনভায়রনমেন্ট লিভ, ইফ ইউ ওয়ান্ট টু লিভ' শিরোনামে একটি কোম্পানি শুরু করলেন। প্রতিষ্ঠানের নাম দিলেন কাজী পেপার কাপ ইন্ডাস্ট্রি বা কেপিসি। কোম্পানির প্রোফাইল তৈরি করে জমা দিলেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। প্রথমেই ছক্কা! পেয়ে গেলেন ৩০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা। হাতে ছিল আরও ১০ লাখ। এই ৪০ লাখ পুঁজি নিয়ে ২০১২ সালে নেমে পড়েন পথে। এক হাজার ২০০ বর্গফুটের ঘর ভাড়া নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনজন সহযোগী সঙ্গে নিয়ে রাত জেগে কাজ করতে থাকেন। মেশিন থেকে একেকটা কাপ বের হয় আর সাজিদের ভেতর থেকে তৃপ্তির হাসি বেরিয়ে আসে।
প্রথম বানানো পেপার কাপ ও প্লেটের কিছু নমুনা নিয়ে মোটরসাইকেলে উত্তরায় শেভরনের নিবন্ধিত সরবরাহকারীর কার্যালয়ে যান। সরবরাহকারী কাপগুলো নেড়েচেড়ে খুশিই হলেন। শুরুতেই মাসে দুই লাখ কাপের অর্ডার দিয়ে দেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান সাজিদ। তার কথায়, 'দিনটি স্বপ্নের মতো ছিল। কিছুটা দুঃসাহস নিয়েই ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলাম।' এর পর প্রতি সপ্তায় চার-পাঁচটি নতুন কোম্পানির অর্ডার আসতে থাকে। পেপসির কাছ থেকেও অর্ডার পান প্রথম মাসে।
বিশ্ব জয়ের পথে
চলতি বছরের শুরুতে নেপালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল 'নেপাল-বাংলাদেশ যৌথ বাণিজ্য মেলা'। সেখানে অংশ নিয়েছিল সাজিদের কেপিসি। কেপিসির স্টল দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন নেপালের পর্যটনমন্ত্রী। স্টল থেকে কিছু পেপার কাপ নিয়ে মঞ্চের ওপর রাখেন। বক্তব্য দেওয়ার সময় সাজিদকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, 'আপনার প্রডাক্ট দারুণ লেগেছে। তাই নিয়ে এলাম।' মেলায় বেশ কিছু অর্ডার পান সাজিদ। এখন কেপিসি থেকে দৈনিক দুই-আড়াই লাখ পেপার কাপ নেপালে রফতানি হচ্ছে। আর অন্যান্য দেশে নিজের অবস্থান তৈরি করতে কাজ শুরু করেছেন সাজিদ।
কেপিসি কেবল ব্যবসা নয়, এটি একটি সেবাও। এ কারণেই এই শিল্পকে দেশের মধ্যে একটি বড় শিল্প খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান সাজিদ। পাশাপাশি এই পণ্য বিদেশে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করা সম্ভব। সাজিদ চান, তরুণরা এই ব্যবসায় এসে আরও এগিয়ে নিয়ে যাক। তবে তরুণদের সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, 'আমি কী করব।' যদি উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে সৎ সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। টাকার চেয়েও বড় মূলধন উদ্যোগ। তাই তরুণদের ভালো উদ্যোগ নিতে হবে। আর পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। হ