হংকংয়ে ফারিহার অন্য সংগ্রাম

তারুণ্য

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০১৯      

আকেল হায়দার

হংকংয়ে ফারিহার অন্য সংগ্রাম

ফারিহা সালমা দিয়া বাকের

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফারিহা সালমা দিয়া বাকের (২০)। জন্ম হংকংয়ে। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন সম্প্রতি। হতে চান হংকংয়ের জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের পক্ষের একজন আইনজীবী। তার কাজের জায়গাটি বাংলাদেশি হিসেবে হংকংয়ে তো প্রথমই, স্থানীয়ভাবেও তিনি প্রথম একজন উকিল হবেন, যিনি কাজ করবেন স্থানীয় সংখ্যালঘুদের আইনি অধিকার রক্ষায়। কাজ ও ভালো লাগার জায়গা থেকে মাত্র বিশ বছর বয়সেই সাবলীলভাবে রপ্ত করেছেন ক্যান্টোনিজ, ম্যান্ডারিন, বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও ফিলিপিনো ভাষা।

হংকংয়ে জাতিগত বিভেদ বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যগুলো তার চোখে খুব করে ধরা পড়ে কৈশোরেই। যেহেতু পারিবারিক সূত্রে হংকংয়েই তার বসবাস তাই ফারিহার ইচ্ছা সে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান অসামঞ্জস্যগুলো কীভাবে দূর করা যায় তা নিয়ে কাজ করা। নিজের কাজের বিষয় ও পরিধির বিষয়ে ফারিহা জানালেন, 'আমি চাই সরকারের মধ্যে আরও বেশিসংখ্যক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ কাজ করুক। যাতে সবার মধ্যে সমঅধিকারের ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং তারাও যেন সমাজে অন্যান্য সবার মতো অধিকারের কথা বলতে পারে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারে।'

হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ফারিহা ইতিমধ্যেই জীবনের একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায়ে পা রেখেছেন। কাজ করছেন দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক আইনপ্রণেতার সমন্বয়ে গঠিত আইনশৃঙ্খলা কাউন্সিলের সহকারী হিসেবে। পঁচিশ বছর আগে ফারিহার বাবা-মা পোশাক ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য উপকরণ উৎপাদনের কাজ নিয়ে স্থানীয় শাখার আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক হিসেবে হংকংয়ে চলে যান। পরবর্তীতে জীবন-জীবিকা ও সন্তানদের সুন্দর আগামীর প্রত্যয়ে সেখানেই স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। বাবা, মা, এক ভাই ও ফারিহাসহ তাদের চার সদস্যের পরিবার কউলুনে বসবাস করেন। প্রতি দুই বছর পর পর নিজের দেশে আসেন আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে দেখা করতে।

আঠারো বছর বয়সে ফারিহা ক্যান্টোনিজ ভাষা রপ্ত করেন, যাতে সাবলীলভাবে এই ভাষাভাষীদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারেন। কর্মজীবনে স্থানীয় ভাষার গুরুত্ব অনেক। এখানকার ভাষা ক্যান্টোনিজ আর স্থানীয় ভাষা জানা না থাকলে চাকরি পেতে অনেক অসুবিধা হয়ে থাকে। ক্যান্টোনিজ হংকংয়ের আবহমান সমাজ সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত। তাই এই ভাষা জানা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য। স্কুলে অধ্যয়নকালীন ফারিহা ক্যান্টোনিজকে বাধ্যতামূলক কোর্স হিসেবে বেছে নেন, যদিও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ সহপাঠী এটাকে তাদের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নিয়ে থাকেন। ভাষা শেখার বিভিন্ন কোর্স গ্রহণের পাশাপাশি টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও নিয়মিত খবরের কাগজে কাজ করা ছিল তার নিত্যকার রুটিন।

ফারিহার চেষ্টা সফল হয়েছে। বিভিন্ন ভাষা রপ্ত করার ফলে অবিচ্ছিন্নভাবে সমাজের সব সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার মতে, কারও সঙ্গে মিশতে গেলে কারও সম্পর্কে জানতে হলে তার সঙ্গে যোগাযোগ খুবই জরুরি। তা খুব সহজে একমাত্র সম্ভব ভাষার মাধ্যমে। উচ্ছ্বাস নিয়ে ফারিহা বলেন, 'আমি সত্যি ভাগ্যবান! চারপাশের এত এত লোক, এত এত সংস্কৃতির সংমিশ্রণ তবু আমি কোনো সমস্যা বোধ করি না। স্কুল, কলেজ, অফিস, হাসপাতাল, ব্যাংক, ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া কোনো কাজেই কোনো সমস্যা পোহাতে হয় না।'

২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী হংকংয়ে মোট ৫৮,৪৩৮৩ জন জাতিগত সংখ্যালঘু অধিবাসী বাস করত, যা শহরটির মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ। হংকং সরকারও জাতিগতভাবে সংখ্যালঘুদের চাকরি ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়ে বেশ উদাসীন। সরকারের ১৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ১.৯ শতাংশ চাকরি আছে সংখ্যালঘুদের জন্য। গেল বছর ফারিহা নিজেকে একজন সংখ্যালঘু হিসেবে ঘোষণা দিয়ে 'ডাইভার্সিটি লিস্ট' তৈরির উদ্যোগ নিয়ে বেশ আলোড়ন তুলেছেন ইতিমধ্যে। সর্বোপরি, বিশাল এই জনগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার, আইনি সহায়তা ও সমাজে তাদের জন্য সাম্য প্রতিষ্ঠায় ফারিহার এই প্রচেষ্টা আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে হংকংয়ের সংখ্যালঘু সমাজে।