ঈদে গতি ফিরছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৫

মিরাজ শামস

চলতি বছরের শুরুতে হরতাল-অবরোধে হোঁচট খেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে টানা তিন মাস দোকান খোলা রেখেও তেমন বেচাকেনা করতে পারেননি তারা। গত এপ্রিলে সিটি নির্বাচনের পর থেকে পরিস্থিতি শান্ত হলেও খুচরা বেচাকেনায় গতি আসতে সময় লাগে। তবে ঈদুল ফিতরে উৎসবকে কেন্দ্র করে কেনাকাটার সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
ঈদবাজার উপলক্ষে বিপণিবিতানগুলোতে এখন বেচাকেনার ধুম পড়ছে। জমে উঠছে রাজধানীর ফুটপাতে হকারদের বেচাকেনা। সব শ্রেণী-পেশার মানুষ ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে বেচাকেনা বাড়ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতি কাটানোর সুযোগ হবে ঈদ উৎসবের এ কেনাকাটায়। এতে মন্থর অর্থনীতির গতিতে আবার চাঙ্গা ভাব ফিরে আসবে।
নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতের ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বছরের শুরুতে তিন মাস রাজনৈতিক সহিংসতার সময় পুঁজি ভেঙে বসে বসে খেতে হয়েছে। এপ্রিলের পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় নতুন ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন। তবে পুরান দেনার দায় এখনও শোধ হয়নি। তিনি বলেন, কেনাবেচার এ ধারা বজায় থাকলে ঋণ শোধ করে ভালোভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
মিরপুর শাহআলী মার্কেটের ব্যবসায়ী মোকলেছুর রহমান সমকালকে বলেন, গত দুই মাস ধরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বেচাকেনা তেমন ছিল না। এখন ঈদ আয়োজন ঘিরে ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া মিলছে। দ্বিগুণের বেশি বিক্রি বাড়ছে। গত ঈদের চেয়েও এবার বেচাকেনা বেশি হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতি অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যবসায়ীরা এবার ঈদবাজার ধরতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়েছে। ঈদের বিক্রি বাড়তে নানা অফার দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে মূল্যছাড় দিয়ে পণ্য বিক্রি করছেন তারা। ঈদে কেবল পোশাক নয়, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস, গৃহস্থালি সমগ্রী ও গহনাসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের বাজারে বেচাকেনা জমে উঠেছে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত দু'বছর অর্থনীতিতে ২৫ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এবার ঈদে বেচাকেনা ভালো হলে তা পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর উৎসবকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার বাড়ছে। যার পরিমাণ ৭০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। সংস্থাটির হিসাবে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণ হয়েছে। এতে উৎসবকেন্দ্রিক অর্থনীতির ব্যাপ্তি দিন দিন আরও বাড়বে।
সমিতির সভাপতি এসএ কাদের কিরণ সমকালকে বলেন, এবার রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় ঈদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে। গত দুই বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় উৎসবে ব্যবসা করতে পারেরনি দোকানিরা। এখন দোকানগুলোতে বেচাকেনা অন্য সব সময়ের চেয়ে ভালো রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে সহিংসতা না থাকায় ব্যবসায়ীরা গত বছরের চেয়ে দ্বিগুণ বিনিয়োগ করেছেন। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিক্রি তিনগুণ বাড়বে।
ফুটপাত ও ছোট মার্কেটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাইরে দেশি ব্র্যান্ডের বড় শপ ও আউটলেটগুলোতেও কেনাবেচা এখন জমজমাট। ক্রেতাদের মধ্যে দেশি ব্র্যান্ডের পণ্যে ঝোঁক বাড়ছে। এতে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি বিক্রি বেড়েছে। ফ্যাশন হাউসগুলোতে অন্য সময়ের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেচাকেনা বেশি হচ্ছে বলে জানান উদ্যোক্তারা।
আড়ংয়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রউফ সমকালকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতি কাটাতে সরকারও ব্যবসায়ীদের রাতে বেচাকেনার সুযোগ দেওয়ায় আরও ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, অন্য সময়ের চেয়ে ঈদে ৩০ শতাংশ বেচাকেনা হয়, এবার তা অনেক বেশি বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতায় বেচাকেনা মন্দায় তখন দোকানগুলোতে কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় ঈদবাজারের প্রস্তুতি ভালো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেচাকেনা সামলে নিতে নতুন নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছেন তারা।
ঈদে কেনাবেচার বিষয়ে দেশি ব্র্যান্ডের পোশাকের সংগঠন ফ্যাশন উদ্যোগের সভাপতি আজহারুল হক আজাদ সমকালকে বলেন, ঈদ উৎসবে দেশি পোশাকের বাজারে গতির সঞ্চার হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় যে মন্দাভাব ছিল তা কেটেছে। তবে এর ক্ষতি পুরোপুরি এ ঈদের বেচাকেনায় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। গত কয়েক বছর ধরে হরতাল অবরোধের নামে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে উঠতে আরও দুই বছর লাগবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে অন্য বছরের চেয়ে এবার ঈদে ব্যবসা অনেক ভালো যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগে উৎসবের কেনাকাটায় বিদেশি পোশাকে ক্রেতাদের যেমন ঝোঁক ছিল, এবার তা হয়নি। এখন অনেক ভালো মানের দেশি ব্র্যান্ড ও সাধারণ পোশাক তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া দামেও তুলনামূলক কম। তিনি বলেন, এর ফলে বিদেশি পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়েছে দেশি ব্র্যান্ডগুলো। এতে ক্রেতাদের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার দেশি পোশাকের বাজারও বেড়েছে।