শিয়ালপণ্ডিতের উত্তরাকাণ্ড

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০১৮

শিয়ালের রকমফের আছে- খেঁকশিয়াল কিংবা পাতিশিয়াল। ইংরেজিতেও আছে ফক্স কিংবা জ্যাকল। গ্রামীণ বন্যপ্রাণী হিসেবে এখনও টিকে থাকা এ প্রাণীর সঙ্গে ধূর্ত বিশেষণটি বেশ যায়। সুযোগসন্ধানী শব্দটিও প্রয়োগ করা হয়। রাতের আঁধারে গৃহস্থের বাড়িতে হানা দিয়ে হাঁস-মুরগি ও ছাগল চুরির বদনাম আছে শিয়ালের। হুক্কাহুয়া রবে তারা উপস্থিতি জানান দেয়।

প্রাণীকুলের শিক্ষক হিসেবে তাদের কোনো ভূমিকা আছে কি-না, সেটা মানুষের বোধের গম্য নয়- কিন্তু মানুষই যে প্রধানত রাতে শিকারে অভ্যস্ত এ প্রাণীর খেতাব দিয়েছে 'শিয়ালপণ্ডিত'। কুমিরের ছানাকে পড়ানোর গল্পের কারণেই কি? প্রাণীকুলের সুরক্ষার জন্য কাজ করেন নানা দেশে, এমন সংবেদনশীল ব্যক্তিদের কাছে কিন্তু শিয়ালের আরেকটি বিশেষণ- 'বড়ই লাজুক'। তারা মানুষের ধারেকাছে আসতে আগ্রহী নয়। সবুজ জঙ্গল তাদের পছন্দের স্থান। দিনের আলোয় পারতপক্ষে গর্ত থেকে বের হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে দ্রুতহারে নগরায়ন ঘটছে, ছায়া সুনিবিড় শান্তির গ্রামীণ জনপদও এখন বালু-ইট-সিমেন্টের জঙ্গল। শিয়ালের ঠাঁই তাহলে কি কেবলই বইয়ে হতে চলেছে? শিশু-কিশোররা এর চাক্ষষ সাক্ষাৎ পাবে না, কেবল তুষ্ট থাকবে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি কিংবা ডিসকভারি চ্যানেলে চোখ রেখে! আমাদের রাজধানী ঢাকার বয়স্ক নারী-পুরুষের হতাশার স্মৃতিচারণ তো অমূলক নয়- 'এই তো সেদিনও এমনকি সিদ্ধেশ্বরী, মতিঝিল, রায়েরবাজার- কত এলাকায় 'থেকে থেকে শোনা গেছে শেয়ালের হাঁক।' আমরা জানি যে, বনানী, গুলশান, বারিধারা, বসুন্ধরা- এসব অভিজাত আবাসিক এলাকা তো শিয়ালের আবাসস্থল সাফ করেই গড়ে উঠেছে। উত্তরা, মিরপুর প্রভৃতি এলাকার বয়স্ক বাসিন্দারা কিন্তু এখনও রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে যাওয়ার সময় অজান্তেই বলে ওঠেন- 'ঢাকা যাই'। গ্রামেই যেখানে শিয়ালের সমস্বরে বা একক বিষণ্ণ কণ্ঠে হাঁক শোনা যায় না, সেখানে রাজধানীতে এর অস্তিত্ব কীভাবে পাওয়া যাবে? সম্ভবত প্রাণীকুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্নদের এমন আকুতি শিয়ালের দল শুনেছে। গত ৩০ মার্চ উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর সড়কের ৮১ নম্বর বাড়িতে আকস্মিকভাবে ঢুকে পড়েছিল একটি শিয়াল। বহুতল ভবনের বাসিন্দারা এটির উপস্থিতি টের পেয়ে আতঙ্ক বোধ করেছেন এবং সেটা স্বাভাবিক। তারা 'জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯' নম্বরে ডায়াল করে সাহায্য চেয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে হাজির ফায়ার সার্ভিসের সুশিক্ষিত কর্মীদল।

বাংলাদেশে নগর সভ্যতার বিস্তার এমন আরও অনেক সুবিধা সৃষ্টি করেছে। এ সংস্থার কর্মীরা অনাকাঙ্ক্ষিত আগুন লাগলে তা নেভায়। পানিতেও নামে ডুবুরি হিসেবে। দুর্গম স্থানে আটকে পড়া চড়ূই ও বিড়াল উদ্ধারেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যে পারঙ্গম সেটা প্রমাণ করেছেন। উত্তরায় বাড়িতে ঢুকে পড়া শিয়ালটি উন্মত্ত আচরণ করছিল। দেখা গেল, সেটাকে জ্যান্ত পাকড়াও করার কৌশলও রপ্ত তাদের। প্রায় বিপন্ন এ প্রাণীটিকে মেরে ফেলা অনুচিত, সে বোধ তাদের রয়েছে। তাই তো এক ঘণ্টার চেষ্টায় শিয়ালটিকে ধরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের উন্মুক্ত এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিবাদন তাদের।

কিন্তু আমাদের ঢাকা যেভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তাতে আগামী দু'চার বছর পর এভাবে কোনো শিয়াল ধরা পড়লে তাকে ছেড়ে দেওয়ার মতো বনভূমি কিংবা উন্মুক্ত স্থান মিলবে কি-না, সে প্রশ্ন সঙ্গত। এখনও তুরাগ নদীর আশপাশে কিছু এলাকায় শিয়ালের জন্য লুকিয়ে থাকার স্থান রয়েছে। মিরপুর চিড়িয়াখানা এলাকাতেও কিছু শিয়ালের দেখা মেলে। তবে তাদের খাদ্যের সংকট আছে কি-না, রোগ-ব্যাধিতে চিকিৎসা

মেলে কি-না- সেসব নিয়ে ভাবার মতো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কতটা সক্রিয়, সেটা অজানা। উত্তরাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলা শিয়ালটি কিন্তু এমন প্রশ্ন নতুন করে রেখে গেল।