পরিবেশ

সুন্দরবনের হুমকি দূর হোক

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ সুন্দরবনের আশপাশে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৯০টি শিল্প কারখানা স্থাপনের অনুমতি কোনো বিবেচনাতেই ইতিবাচক হতে পারে না। আমাদের আশঙ্কা, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে উচ্চ আদালতে উপস্থাপিত এই 'সরকারি' প্রতিবেদনের ভাষ্যের চেয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও নাজুক। মনে রাখতে হবে, এই তালিকা কেবল 'অনুমোদিত' শিল্প স্থাপনার। ওই অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃহৎ শিল্পায়নের উদ্যোগে সরকারের অনুমোদনের বাইরেও আরও নানা পরিবেশ বৈরী স্থাপনা গড়ে উঠছে। আমরা মনে করি, একটি স্পর্শকাতর এলাকায় এত শিল্প স্থাপনা অগ্রহণযোগ্য। এর মধ্যে ২৪টিই 'লাল' শ্রেণিভুক্ত বা ব্যাপক হুমকিমূলক। এর মধ্য দিয়ে সরকার নিজের ঘোষিত আইন ও নীতির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে। ১৯৯৯ সালে সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' বা ইসিএ ঘোষণা করেছিল। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ইসিএ ঘোষিত এলাকায় যে কোনো ধরনের কারখানা নিষিদ্ধ। আমরা আশা করি, সুন্দরবন নিয়ে এই যথেচ্ছাচারের প্রতিকার উচ্চ আদালতে পাওয়া যাবে। এর বিকল্পও নেই। আমরা জানি, সুন্দরবনের নির্বিঘ্ন থাকা কেবল বনটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশ্বের বৃহত্তম এই প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, প্রতিবেশগত, এমনকি সাংস্কৃতিক তাৎপর্য গভীরভাবে জড়িত। এই বন যেমন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগে আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে, তেমনই এর বনজ সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে বিপুল ভূমিকা রেখে চলেছে। জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে এই বনের স্বাতন্ত্র্যও বিশ্বে বাংলাদেশকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। বিবিধ গুরুত্ব, তাৎপর্য ও স্বাতন্ত্র্যই কিন্তু সুন্দরবনকে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল ও রামসার সাইটের মর্যাদা দিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এত গুরুত্ব সত্ত্বেও বনটির 'মর্যাদা' আমরা রক্ষা করতে পারছি না। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যান্ত্রিক নৌযান চলাচল, বনদস্যুদের গাছ ও প্রাণী শিকার এর স্বাভাবিক প্রতিবেশ বিনষ্ট করে চলেছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতো এসেছে সুন্দরবনের কোলঘেঁষে প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এর ওপর যদি কমবেশি দুইশ' শিল্প স্থাপনা চালু হয়, তাহলে বনটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ কতটা বজায় থাকবে, আমাদের সন্দেহ রয়েছে। মনে রাখতে হবে, অমূল্য সম্পদ সুন্দরবন জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বছরে কমবেশি সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক 'ঢাল' এই বন প্রাকৃতিকভাবেও নানা হুমকির মুখে পড়ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। উজানের নদীগুলোতে মিঠাপানির ক্ষীণ প্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রস্রোতের ভারসাম্যহীনতা যে বনটির সংকোচন ঘটাতে পারে, এমন আশঙ্কা ইতিমধ্যেই নানা সমীক্ষায় উচ্চারিত হয়েছে। এর ওপর মানবসৃষ্ট হুমকি তৈরি করে সুন্দরবনের জন্য শঙ্কা আরও গভীর হতে দেওয়া যায় না। আমরা আশা করি, দেশের নীতিনির্ধারকরা এই বাস্তবতা উপলব্ধি করবেন। পরিস্থিতির আরও অবনতির আগেই সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় শিল্প স্থাপনা বসানোর উদ্যোগ বা অনুমোদন থেকে সরে আসবেন।