জ্ঞানের জগতে যোগ্য স্থান পেতে হলে

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৯

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের স্থান নয়, বরং যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় গবেষণাকাজ। গবেষণার ফল তুলে ধরার জন্য আমরা দেখি নানা আয়োজন- সেমিনার, ওয়ার্কশপ, প্রকাশনা। এর কী প্রভাব পড়তে পারে, দেশ ও দশের এবং সর্বোপরি বিশ্বসমাজের কল্যাণসাধনে কী অবদান রাখতে পারে, সেটা তুলে ধরা হয় এভাবে। স্বীকৃত প্রকাশনায় গবেষণার ফল যেন প্রকাশ পায়, সে জন্য গবেষক ও তার পৃষ্ঠপোষকরা বিশেষভাবে মনোযোগী থাকেন। এটা সংশ্নিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রকাশনায় হতে পারে, জাতীয়ভাবে হতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হলে তো কথাই নেই। বুধবার সমকালে 'বৈজ্ঞানিক নথি প্রকাশে আবার শীর্ষে বুয়েট' শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি, গত বছরে বাংলাদেশ থেকে গবেষণা নিবন্ধসহ পাঁচ হাজার ২৩৪টি বৈজ্ঞানিক ডকুমেন্টস বা নথি প্রকাশ হয়েছে। আগের দুই বছরের তুলনায় তা অনেক বেশি। গবেষণাকাজ পর্যবেক্ষণকারী 'সায়েন্টিফিক বাংলাদেশ' জানিয়েছে, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবারেও গবেষণা নথি প্রকাশে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এটা ইতিবাচক দিক। এ প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের অভিনন্দন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কেবল সরকারকেই উদ্যোগী হতে দেখেছি আমরা। এখন বেসরকারি খাতও এগিয়ে এসেছে। দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অন্তত দেড়শ'। বৈজ্ঞানিক নথি প্রকাশ ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকার অর্থ হচ্ছে গবেষণাকাজ বেড়ে যাওয়া। আমরা জানি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রথমে গবেষণা শুরু করেছিলেন। এ ধারণা সফল প্রমাণিত হওয়ায় দেশ-বিদেশে তা ছড়িয়ে পড়ে। মহাখালীর কলেরা হাসপাতাল নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি (প্রকৃত নাম আইসিডিডিআর'বি) নামমাত্র ব্যয়ের চিনি-লবণ-পানি ব্যবহার করে ডায়রিয়া চিকিৎসার যে পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, তার স্বীকৃতি মিলছে গোটা বিশ্ব থেকে। তাদের অতি সস্তা দামের স্যালাইন প্রাণ বাঁচাচ্ছে অগণিত মানুষের। প্রকাশনার মাধ্যমেই এসব জানছে দেশ-বিদেশে জ্ঞানের জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকা অগণিত মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বলা হয়ে থাকে- প্রকাশ করো, নইলে শেষ হয়ে যাও। তবে কিছু প্রকাশ করতে হলে আগে তো চাই গবেষণা। অবশ্যই তা মানসম্পন্ন হতে হবে। পণ্ডিতজনের কাছে স্বীকৃত হতে হবে। কোনো গবেষণাকাজের ফল স্বীকৃত জার্নালে নিবন্ধ প্রকাশিত হলে অনেকের কাছে তা পৌঁছার সুযোগ ঘটে। আমাদের গবেষকদের এ কাজটি আরও বেশি বেশি করা চাই। এটাও মনে রাখতে হবে, জার্নাল কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে লেখা প্রকাশ যেন কেবল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্য কর্মস্থলে পদোন্নতির জন্য না হয়।

গবেষণাকাজের জন্য যেমন ব্যক্তির উদ্যোগ-আগ্রহ থাকা চাই, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পৃষ্ঠপোষক। প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে এটা হতে পারে, দেশের দিক থেকে হতে পারে। এ জন্য অর্থের জোগান অবশ্যই থাকতে হবে। আমরা দেখি, যেসব শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের কাজের জন্য সমাদৃত- তাদের এ সমস্যা কম। অন্যদিকে, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগও পরিত্যাগ হয়ে যায় প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে, এমন নজিরও কম নয়। বাংলাদেশে এই শেষোক্ত সমস্যা বিশেষভাবে প্রকট। আমাদের অনেক তরুণ-তরুণী উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে গবেষণাকাজে ঈর্ষণীয় সাফল্য পাচ্ছে। দেশের ভেতরে একই ধরনের সুবিধা সৃষ্টির প্রতি মনোযোগ প্রদান এখন সময়ের দাবি। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের গণ্ডি অতিক্রম করে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে অবস্থান গ্রহণে দৃঢ়সংকল্প। আর্থসামাজিক উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত রাখার জন্য গবেষণার প্রতি মনোযোগ বাড়াতেই হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত সরকারের এবং একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থাকা চাই। কেউ ভালো কাজ করলে তার ইতিবাচক মূল্যায়নও হতে হবে। দেশের ভেতরে ও বাইরে তার বহুল প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই না বাংলাদেশ জ্ঞানের রাজ্যে নিজের উপযুক্ত স্থান করে নিতে পারবে।