সৌদিতে নারী কর্মী

'শ্রমশিশু' চাই না

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বাংলাদেশ দুর্ভাগ্যজনকভাবে 'যুদ্ধশিশু' শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর-শান্তি কমিটির সদস্যদের বর্বরতার শিকার হয়েছিলেন কয়েক লাখ নারী। এ ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী অপরাধে কয়েকজনের বিচার শেষে দণ্ড কার্যকর হয়েছে। এখনও বিচারকাজ চলছে। আমরা এটাও স্মরণ করতে পারি, একাত্তরের যুদ্ধশিশুদের পিতৃ-পরিচয়ের কঠিন প্রশ্ন যখন সামনে আসে, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই ঘোষণা দেন- 'এদের পিতা শেখ মুজিবুর রহমান'। তার এ মহানুভবতা ভুলবার নয়। তিনি লাঞ্ছিত-ধর্ষিত নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন; মা-শিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার চার যুগ পরও দুর্ভাগ্য আমাদের নারীদের পিছু ছাড়ছে না। আর্থ-সামাজিক নানা সূচকে আমরা এগিয়ে চলেছি। কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য এ অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় ঈর্ষণীয়ও বটে। তারপরও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে আমাদের নারী কর্মীদের কাজের জন্য পাঠাতে হচ্ছে। তাদের অনেকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়, চুক্তি অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না, প্রতিদিন অবমাননাকর আচরণ করা হয়- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এটাও বলা হয়, যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলেও ওইসব দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস অনেক ক্ষেত্রে নারী কর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। শনিবার সমকালে 'শ্রমশিশুদের' কান্না শুনতে কি পান শীর্ষক প্রতিবেদনে লাঞ্ছিত-ধর্ষিত কয়েকজন নারীর করুণ-মর্মস্পর্শী কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন- এসব নারী এবং তাদের 'অবাঞ্ছিত শিশুদের' পাশে কেউ দাঁড়ায় না। বাংলাদেশ সরকার এবং সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের হয়ে আইনি লড়াইয়ে যায় না। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের কর্মীরা বিপদে পড়লে তাদের সহায়তা প্রদানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ড। কিন্তু সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোর্ডের মহাপরিচালক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন- 'কোনো নারী ধর্ষিত হয়ে দেশে ফিরেছে- এমন তথ্য তার জানা নেই।' অথচ নারী শ্রমিক কেন্দ্র থেকে একাধিকবার বিষয়টি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও 'বাংলাদেশের মেয়েরা মামলা করতে চায় না বলেই সৌদি সরকার বিচার করে না' মন্তব্য করে দায়িত্ব শেষ করতে চেয়েছেন। সৌদি আরবে কঠোর ইসলামী শাসন চালু আছে। সেখানে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়। কোনো বাংলাদেশি নারী ধর্ষণ কিংবা অন্যভাবে অপরাধের শিকার হলে তার হয়ে আইনি লড়াইয়ে তো এগিয়ে আসার কথা বাংলাদেশ দূতাবাসের। বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ এবং পররাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয়কে এ ঘৃণ্য অপরাধে জড়িতদের কঠোর শাস্তি ও অপরাধের শিকারদের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ে সক্রিয় হওয়ার কথা। এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও পাশে পেতে হবে এবং সেটা আপনাআপনি পাওয়া যায় না। আমরা আশা করব, প্রবাসে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের লাঞ্ছনা-যৌন হয়রানি বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসসহ সংশ্নিষ্ট সবার দ্রুত টনক নড়বে। এ জন্য কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি অপরাধের শিকারদের পুনর্বাসন এবং অন্যান্য সহযোগিতা প্রদানের প্রতিও নজর দিতে হবে। আমরা চাই না- আর কোনো 'শ্রমশিশু' ভূমিষ্ঠ হোক।