কৃষি জমি সুরক্ষা

সময়ে এক ফোঁড় দিন

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

দেশের উপজেলাগুলোকে মহাপরিকল্পনার আওতায় আনার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা বর্তমান সরকারের ঘোষিত নীতিরই প্রতিফলন। আমরা দেখেছি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারেও টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন দলটি গ্রামাঞ্চল রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শহরের সব সুযোগ-সুবিধা যাতে গ্রামে বসেই পাওয়া যায়, সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মহাপরিকল্পনার বিকল্প নেই। কারণ, অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো গড়ে উঠলে পরে সেটাকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা কঠিন। আমরা দেখতে চাইব, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আমলে নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই কার্যক্রমে সবকিছুর আগে যা করা প্রয়োজন তা হচ্ছে, কৃষি জমিগুলোর সুরক্ষা। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, গোটা দেশেই কৃষি জমির পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। কিন্তু দেশজুড়ে এই প্রবণতা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোর 'উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন' ভূমি তো বটেই, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও কৃষি জমির অকৃষি ব্যবহারের চাহিদা যেন চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। স্বীকার করতে হবে, ভূমির কৃষিজ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আর্থিক সুবিধা একটি মন্থর প্রক্রিয়া। সে ক্ষেত্রে আবাসন কোম্পানি বা শিল্পোদ্যোক্তারা যখন বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতে চান, তখন কৃষি জমির মালিকদের পক্ষে চাষাবাদের পক্ষে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে স্বেচ্ছায়ও অনেকে তাদের কৃষি জমি বিক্রি করে দেয়।

অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক বাধ্য হয়েও আবাসিক কোম্পানির কাছে জমি হস্তান্তর করে। কৃষি জমি রক্ষা করতে চাইলে এ ক্ষেত্রে দুর্বল পক্ষ কৃষকের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এও ভুলে যাওয়া যাবে না যে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এএলআরডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক যুগে সাড়ে ২৬ লাখ একরের বেশি কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। অথচ ভূমির বৈধ মালিক চাইলেও জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে পারে না। কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন অনুসারে কৃষি জমি কৃষি কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ কোথায়? বিষয়টি কেবল আইনের প্রশ্নও নয়, দূরদর্শিতার ব্যাপার। কৃষিপ্রধান একটি দেশে খাদ্য উৎপাদনই হতে হবে অগ্রাধিকার। আবাসন বা শিল্প স্থাপনের জন্য অনাবাদি অনুর্বর জমি রয়েছে। মনে রাখা জরুরি, একটি কৃষি জমিতে আবাসন বা শিল্প গড়ে তোলার অর্থ হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা। কৃষি জমি যেহেতু লোকালয়ের কাছেই থাকে, এর পরিবেশ ও প্রতিবেশগত প্রতিক্রিয়াও নিশ্চয়ই বিবেচনাযোগ্য। আমরা দেখতে চাইব, কৃষি জমি সুরক্ষা আইনের যথার্থ প্রয়োগ হচ্ছে। অন্যথায় ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমির পরিমাণ আরও কমে যাবে। বাড়তে থাকবে বহুমাত্রিক কুফল। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর নির্দেশনার পর এ ব্যাপারে নির্লিপ্ততার অবকাশ নেই। এখনই এক ফোঁড় না দিলে, পরে দশ ফোঁড় দিয়েও আর কাজ হবে না।