দক্ষতা-ক্ষিপ্রতা বনাম ধীরগতি

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯      

নামে কি-ইবা আসে যায়- এটা প্রবাদ। বিড়াল যে রঙেরই হোক না কেন, হুলো কিংবা মেনি- জাত যাই হোক না কেন, ইঁদুর মারে কি-না সেটাই আসল কথা। পিস্তল কিংবা রিভলবার অথবা এ ধরনের ভয়ঙ্কর অস্ত্রসম বস্তু দিয়ে আপনি কাউকে ভয় দেখাতে পারেন কি-না, সেটাই আসল কথা। ছুরি-চাকু দিয়েও ভয় দেখানো যায়। 'প্রবাদপ্রতিম' হয়ে ওঠা ডাকাতের নামে বন্দুকওয়ালা ধনাঢ্য পরিবারের লাঠিয়ালরা পালিয়ে গেছে- এমন নজির বাংলা সাহিত্যে ভূরি ভূরি। পলাশ আহমেদ নামের ২৫ বছর বয়সী যুবক খেলনা পিস্তল দেখিয়েই ময়ূরপঙ্খী নামের উড়োজাহাজটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছিল। এ ঘটনা ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী বিমানে ওঠার আগে এই দুস্কৃতী খেলনা পিস্তল নিয়ে নির্বিঘ্নে যাবতীয় চেকিং পয়েন্ট অতিক্রম করতে পারে। সেই ষাটের দশকের শেষদিকে প্যালেস্টাইনের তরুণী লায়লা খালেদ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি বিমান হাইজ্যাক করে দুনিয়াব্যাপী শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন।

প্রথম হাইজ্যাক করেন ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে। তার লক্ষ্য ছিল, প্যালেস্টাইন ভূখণ্ড জবরদখল করে রাখা ইসরায়েলের ওপর আঘাত হানা। রোম থেকে এথেন্সগামী বিমানটি নিয়ে যাওয়া হয় সিরিয়ায়। তিনি বন্দি হন; কিন্তু মাস দুয়েকের মধ্যে সে দেশের প্যালেস্টাইনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল সরকার তাকে মুক্তি দেয়। বছরখানেক পর আরেকটি বিমান হাইজ্যাকের ঘটনাতেও তিনি যুক্ত ছিলেন। ইসরায়েল এবং তার সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের ক্ষমতাসীনদের কাছে তিনি ছিলেন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী; কিন্তু অনেকের কাছেই হয়ে ওঠেন আইকনিক ওম্যান। এর পর বিশ্ব বিমান হাইজ্যাকের অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। কেউবা বলেছেন, নির্দিষ্ট ইস্যুতে বিশ্বসমাজের নজর কাড়ার জন্যই হাইজ্যাকের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কাজটি করেছেন। কেউবা 'সহযোদ্ধাদের মুক্তি' ও আর্থিক সুবিধা আদায় করতে চেয়েছেন। ১৯৭৭ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ এ ধরনেরই একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল। জাপানের রেড ব্রিগেড নামে গোষ্ঠী একটি বিমান ছিনতাই করে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণে বাধ্য করে এবং যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে। এক পর্যায়ে আটক কয়েকজন সহযোদ্ধাকে জাপানি কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থসহ তাদের হাতে তুলে দেওয়ার পর তারা নির্বিঘ্নে বাংলাদেশ ভূখণ্ড ত্যাগ করে।

এ ধরনের কয়েকটি হাইজ্যাকের ঘটনার পর থেকে বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করা হতে থাকে। বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতেও সেটা আমরা প্রত্যক্ষ করি। পিস্তল কিংবা খেলনা পিস্তল অথবা ভয় দেখানো কাজে ব্যবহার হতে পারে, এমন যে কোনো বস্তু নিয়ে বিমানে ওঠার তো প্রশ্নই আসে না; বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশ করাও নিষিদ্ধ। নখ কাটা বা পেন্সিল কাটার সরঞ্জাম এমনকি পানির বোতলও 'ভয়ঙ্কর' তালিকার অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ যাত্রী তো বটেই, এমনকি ভিভিআইপি যাত্রীদেরও বিভিন্ন বিমানবন্দরে কত ধরনের 'হেনস্তা' করা হয়, তার কী যে জ্বালা ও যাতনা, সেটা কহতব্য নহে। পলাশ আহমেদ নামের 'হতাশ' কিংবা 'মস্তিস্কে গোলমাল' থাকা তরুণের ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজ হাইজ্যাকের চেষ্টার পেছনে কারণ যা-ই থাকুক না কেন এবং এ জন্য যে 'অস্ত্রই' ব্যবহার করা হোক না কেন, সে অপরাধ করেছে গুরুতর। বিমানটির যাত্রীরা প্রমাদ গুনেছেন, প্রাণভয়ে কম্পমান- এটাই বাস্তবতা।

তাকে কাবু করায় বিমানটির পাইলট-ক্রু ও আমাদের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কর্মকাণ্ডে ছাপ মেলে উপস্থিত বুদ্ধি, দক্ষতা ও ক্ষিপ্রতার। এ জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক বিভাগের প্রতিবেদনে। হাইজ্যাক চেষ্টার দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা জানিয়েছে, ব্যালিস্টিক পরীক্ষা বলছে, পলাশ আহমেদের পিস্তলটি ভয়ঙ্কর কিছু নয়, নিছকই খেলনা। আগ্নেয়াস্ত্র ও তার গুলি কতটা ভয়ঙ্কর, সেটা জানার জন্য যে পরীক্ষা করা হয়, তার নাম ব্যালিস্টিক টেস্ট। বিমানটি হাইজ্যাকারের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য যে দক্ষতা-ক্ষিপ্রতা আমরা দেখেছি, তার সঙ্গে কিন্তু পিস্তলের ক্ষমতা পরীক্ষা প্রক্রিয়ার অতি ধীরগতি একেবারেই মেলে না। পিস্তলটি যে নিছকই খেলনা- সেটা বুঝতে এত সময় লাগল! সংশ্নিষ্টরা নিশ্চয়ই বিষয়টি ভেবে দেখবেন।