নদীদূষণ

প্রধানমন্ত্রীর সময়োচিত আহ্বান

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯      

বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নদীদূষণ বন্ধের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা সময়োচিত। আমরা জানি, বর্তমানে বাংলাদেশের নদনদীর মূল সংকট পাঁচটি- দখল, দূষণ, প্রবাহস্বল্পতা, নির্বিচার বালু উত্তোলন ও অপরিকল্পিত স্থাপনা। এর মধ্যে দখল উচ্ছেদে ইতিমধ্যে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহে নদনদী দখলমুক্ত করার কাজ গতি পেয়েছে। নদীর দ্বিতীয় সংকট দূষণ নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হওয়ার সময় এসেছে এখন। এ ক্ষেত্রে শিল্পদূষণ সবচেয়ে মারাত্মক হলেও এর নিয়ন্ত্রণ ছিল সবচেয়ে সহজ। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রেই বর্জ্য শোধন একটি আবশ্যিক শর্ত। প্রত্যেকটি শিল্প কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি থাকা কেবল বাধ্যতামূলক নয়; এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে আকস্মিক পরিদর্শন এবং বিচ্যুতিতে জরিমানার বিধানও রয়েছে। কিন্তু শুভঙ্করের ফাঁকি হচ্ছে, ইটিপি থাকলেও তা চালু করা হয় না। পরিদর্শনের সময় সাময়িক সচল হলেও পরবর্তী পরিস্থিতি তথৈবচ। আরও দুর্ভাগ্যের বিষয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার পক্ষেও দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে নজরদারির অভাব রয়েছে। রয়েছে অনিয়মেরও অভিযোগ।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও যে সহজ নয়, স্বীকার করতে হবে। এর ফলে দখল যেমন, দূষণও চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। আমাদের স্বচ্ছতোয়া নদীগুলো ক্রমেই সুপেয় পানি, সেচ কাজ, গৃহস্থালি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ছে। বিনষ্ট হচ্ছে মৎস্যসম্পদ, নদী-তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে রোগ-ব্যাধি। নির্মম পরিহাসের বিষয়, যে শিল্পদূষণে নদনদীর পানি ও জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে, সেই প্রবাহ শিল্প উৎপাদনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নদীর পানি দূষিত হওয়ায় তা শিল্পের জন্যও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ফলে চাপ বাড়ছে ভূগর্ভস্থ জলস্তরে। আর তার সুদূরপ্রসারী ক্ষতির কথা আমরা জানি। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান আমলে নেওয়ার বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোও দূষণবিরোধী আইন ও বিধির যথার্থ প্রয়োগে উদ্যোগী হবে। একই সঙ্গে আমাদের শিল্পপতিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও জরুরি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পোদ্যোগের যে ভূমিকা, নদীদূষণ বন্ধের মাধ্যমে তা যে আরও গৌরবোজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে, তাদের বোঝাতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, নদীদূষণের মতো আত্মঘাতী তৎপরতা সম্পর্কে তাদের যথাযথভাবে বোঝাতে পারলে দূষণ রোধে তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসবেন। শিল্পদূষণের পাশাপাশি নাগরিকদূষণও বন্ধ করার বিকল্প নেই। আমরা গভীর হতাশা ও উদ্বেগের সঙ্গে দেখি যে, প্রায় সব নগর ও শহরে পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত শোধনাগার নেই। নাগরিক বর্জ্যের একটি বড় অংশ সরাসরি নদীতে ফেলা হয়। নগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাই যদি এভাবে নদীদূষণ করে, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে? আমরা দেখতে চাইব, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের পর তারাও সংযত ও সতর্ক হয়েছে। নদীপথে চলাচল করতে গিয়ে নদীদূষণের যে অসচেতনতা আমরা দেখি, সেই প্রসঙ্গ প্রধানমন্ত্রীও তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। বস্তুত একটি পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত নদী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সচেতন নাগরিকই হতে পারে উত্তম প্রহরী।