ঈদুল ফিতর

সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০১৯      

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমরা সমকাল পরিবারের পক্ষে পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ীসহ সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। রমজান মাসের শেষ দিন সন্ধ্যাঘন পশ্চিমাকাশে শাওয়াল মাসের বাঁকা চাঁদ উদিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে ঈদের আনন্দ। বাঙালি মুসলমানের সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক জীবনে ঈদের আবাহনী নিয়ে আসে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অতুলনীয় সঙ্গীত- 'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ'।

বাংলাদেশের জন্য এবারের ঈদে বাড়তি আনন্দ বয়ে নিয়ে এসেছে ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের এক উপভোগ্য বিজয়। ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি দক্ষিণ আফ্রিকা রোববার আমাদের দামাল ছেলেদের কাছে 'রেকর্ড রানে' হারার পর উজ্জ্বল ও উল্লাসমুখর হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মধ্যরাত। এই জয় ঈদের আনন্দে যে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই প্রত্যাশা ছিল প্রস্ম্ফুটিত। বস্তুত ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে সমকালের বিশেষ আয়োজন 'ছক্কা'র সম্পাদকীয়তেও শিরোনাম দেওয়া হয়েছিল 'আসুক ডাবল আনন্দ'। আমরা জানি, আগামী বুধবার নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। আমাদের প্রত্যাশা, সেদিনও বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের ঈদ আনন্দ দ্বিগুণ করে তুলবে টাইগাররা।

আমরা দেখছি, এবারের ঈদুল ফিতর বাংলাদেশে এমন সময় এসেছে, যখন চাষিরা বোরো ধান কাটার মৌসুম শেষের দিকে। এটা ঠিক যে, ধানের বাম্পার ফলন হলেও কেটে ঘরে তোলার ক্ষেত্রে উচ্চ মজুরি কৃষকের উৎপাদন খরচ বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাজারের নিম্নগতি। আশার কথা, দেশের কোথাও কোথাও জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি নির্ধারিত মূল্যে ধান কিনেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষার্থীরা অনেক জায়গায় যেভাবে কৃষককে ধান কেটে দিয়েছে, তাও ছিল অভূতপূর্ব। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনও এ ব্যাপারে এগিয়ে এসেছে। আমরা মনে করি, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ বাজারেও ধানের দাম যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কৃষকের ঈদ আনন্দ দ্বিগুণ হবে। ঈদের পরেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারে কর্তৃপক্ষ। মনে রাখতে হবে, কৃষকের ঘরের সচ্ছলতা গোটা সমাজের অন্যান্য ঘরেও আনন্দ বাড়িয়ে তোলে। বাড়িয়ে তোলে গোটা দেশের আর্থ-সামাজিক সক্ষমতা। এও স্বীকার করতে হবে, এবার রমজান মাসে দেশের কোথাও কোথাও ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলের ক্ষেত ও ফলের বাগান। আমরা প্রত্যাশা করি, এর ফলেও ক্ষতিগ্রস্তদের ঈদ উদযাপনে বিঘ্ন ঘটবে না। বস্তুত সুখ-দুঃখ, আনন্দ, বেদনা নিয়েই প্রতিবছর আমাদের মাঝে আসে ঈদুল ফিতর। জাগতিক সব বঞ্চনা ও বেদনা সত্ত্বেও আধ্যাত্মিক এই উপহারকে আমরা স্বাগত জানাই।

এবার বিশেষভাবে ঢাকার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত সংযোগকারী মহাসড়কগুলোতে অনেকটা স্বস্তি এসেছে। উত্তরবঙ্গগামী মহাসড়কে গাজীপুরের চন্দ্রায় ঈদের আগে আগে উড়াল সড়ক চালু হওয়ায় ওই এলাকায় আগের মতো তীব্র যানজট নেই। গত ঈদে আমরা দেখেছি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হলেও কুমিল্লায় দুই লেনের মেঘনা ও গোমতী সেতুর কারণে দীর্ঘ যানজট তৈরি হতো। এর পাশাপাশি ফেনীতে ছিল উড়াল সড়ক নির্মাণের বিড়ম্বনা। এবার ঈদের আগে দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু উদ্বোধন হওয়ায় কয়েক ঘণ্টার যানজট এখন কয়েক মিনিটে পার হওয়া যায়। পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে ফেনীতেও। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলমুখী ফেরিযুক্ত মহাসড়কের পরিস্থিতিও এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে। আমরা প্রত্যাশা করি, এই পরিস্থিতি ঈদের আগে-পরেও অব্যাহত থাকবে। মানুষের ঘরে ও কর্মস্থলে ফেরা হবে নির্বিঘ্ন। পাশাপাশি রেলপথের পরিস্থিতি উন্নতি করতেই হবে। এত আলোচনা ও আবেদন সত্ত্বেও এবারও দেখা গেছে সিডিউল বিপর্যয়। আমাদের প্রশ্ন, বাজেট বরাদ্দ ও জনবল বাড়িয়ে তাহলে লাভ কী? আমরা দেখতে চাইব, ঈদের আগের দিনগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্তত ঈদের পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখবে রেল কর্তৃপক্ষ। নৌপথেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এবার ঈদুল ফিতর পালিত হচ্ছে গ্রীষ্ফ্ম ও বর্ষার সংযোগস্থলে তথা ঝড়-বাদলের দিনে। গত কয়েক বছরে অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে আকাশপথেও।

ঈদুল ফিতরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা চাইব, কোথাও যেন ফাঁক না থাকে। আমাদের মনে আছে, ২০১৬ সালের ঈদুল ফিতরের মাত্র কয়েক দিন আগে গোটা বাংলাদেশ শোকাহত হয়েছিল গুলশানের হলি আর্টিসানের নৃশংস জঙ্গি হামলায়। ঈদের দিনও দেশের বৃহত্তম জামাতের কাছে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই দুই হামলার সঙ্গে জড়িতরা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের অনুসারী ছিল বলে পরবর্তীকালে জেনেছি আমরা। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বঘোষিত খেলাফতের পতনের পর ওই জঙ্গিরা নিজ নিজ দেশে ফিরছে, পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে। আমরা চাইব, এবার ঈদে কোনো ধরনের জঙ্গি ও উগ্রবাদী তৎপরতা রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে। আমাদের প্রত্যাশা, শ্রেণি সম্প্রদায়, ধর্ম নির্বিশেষে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে। ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়ানো এবং নিজের আনন্দ অন্যের মধ্যেও বিলিয়ে দেওয়ার যে শিক্ষা ঈদুল ফিতর দিয়ে থাকে, সবার মধ্যে তা সঞ্চারিত হবে। বাংলাদেশের ধর্ম ও আদর্শ নির্বিশেষে সব মানুষ শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করবে। বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন।