রোহিঙ্গা শিবির

নিরাপত্তা ও নজরদারিতে ছাড় নয়

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৯

রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে 'নতুন করে' ভাবছে সরকার- রোববার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এই ভাষ্যকে আমরা স্বাগত জানাই। বস্তুত এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও আমরা একাধিকবার বলেছি যে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো ঘিরে নিরাপত্তা ও নজরদারিতে ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দশকের পর দশক ধরে যে রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত নিপীড়ন চলছে, সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চয়ই সহানুভূতিশীল। ২০১৭ সালের আগস্টে আসা রোহিঙ্গাদের কেবল নয়, নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে দলবেঁধে বা বিচ্ছিন্নভাবে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এটাও সত্য, বাংলাদেশের সদিচ্ছা অবারিত হলেও সামর্থ্য সীমিত। বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো আমাদের অব্যবহূত ভূমি নেই যে, একটি জনগোষ্ঠী অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকতে পারবে। শরণার্থীর সংখ্যাও বিবেচ্য। যেমন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার জনসংখ্যা কমবেশি তিন লাখ। সেখানে যদি ১০ লাখের বেশি শরণার্থী এসে হাজির হয়, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে সহজেই অনুমেয়। এটা ঠিক, নতুন পর্যায়ে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর হাতের ছাপযুক্ত নিবন্ধন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জাতিসংঘ পরিচালিত শরণার্থী শিবিরগুলোর বাইরেও রয়েছে বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এ ছাড়া এখনও অব্যাহত রয়েছে বিভিন্ন মাত্রায় অনুপ্রবেশ। আরও ভাবনার বিষয়, নৃতাত্ত্বিক ঘনিষ্ঠতা ও কিছু রাজনৈতিক-সামাজিক আনুকূল্যের কারণে তাদের একটি অংশ বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মূল স্রোতে মিশে যেতে পেরেছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে তারা মধ্যপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশেরই জনশক্তির বাজারে ভাগ বসিয়েছে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও নিছক ভোটের বাজারে সুবিধা পেতে অনেককে ভোটার তালিকাভুক্ত করতে সহায়তা করছে স্থানীয় রাজনীতিকদের কেউ কেউ। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো রোহিঙ্গাদেরও একটি অংশকে নানা অপতৎপরতায় ব্যবহার করছে আইন ও সমাজবিরোধী গোষ্ঠীগুলো। রোহিঙ্গা শিবির ঘিরে গড়ে উঠছে অপরাধী চক্র। মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানে তারা জড়িয়ে পড়ছে; পাচারের শিকার হচ্ছে নারীরা। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন উদ্ৃব্দত করে সমকালেই সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, শুধু এক বছরে ওই এলাকা থেকে শরণার্থী এই জনগোষ্ঠীর শতাধিক সদস্য আটক হয়েছে। এতে করে বোঝা যায়, সেখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা অবনতি ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতেই হবে। কিন্তু সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য যেভাবে কেবল বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও এসবির ওপর নির্ভরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, আমরা তা পুনর্বিবেচনা করতে বলি। একটি বিপুল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধান ও নজরদারি ব্যবস্থায় শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট হতে পারে না। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে অপতৎপরতা রুখতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কর্মরত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বকেও বুঝতে হবে, আইন ও শৃঙ্খলা মেনে অবস্থানই তাদের জন্য মঙ্গলজনক।