সবুজ উদ্যান ও সজীব জিপিও

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯      

ঢাকার জিপিও বললে মানসপটে ভেসে ওঠে জিরো পয়েন্টের পাশের একটি লালচে বিল্ডিং। যার একদিকে সচিবালয়, অন্যদিকে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ। ঢাকার গুলিস্তানের পাশে অবস্থিত এ জিপিও তথা জেনারেল পোস্ট অফিস নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় ৯ হাজার ৮৮৭টি ডাকঘরের মধ্যে এটিই প্রধান। বাংলাদেশের স্বাধীনতারও আগ থেকে স্থাপিত এ ঐতিহাসিক জিপিও সরে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় এ ডাকঘরটি স্থানান্তর হবে ঢাকার আগারগাঁওয়ে। আর জিপিওর বর্তমান স্থানটিকে সবুজ উদ্যান হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার সমকালের প্রথম পাতায় প্রকাশিত 'গুলিস্তানের জিপিও হচ্ছে সবুজ উদ্যান' শিরোনামে তার বিস্তারিত এসেছে। প্রতিবেদনটি বলছে, মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) দেশের জরাজীর্ণ ডাকঘরগুলোর সংস্কার প্রকল্প অনুমোদনের সময় প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ সাধুবাদযোগ্য। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে সবুজ উদ্যান স্থাপন পরিবেশ সুরক্ষায় তো বটেই, নাগরিকদের জন্যও স্বস্তিদায়ক হবে। প্রতিদিন সারাদেশের লাখো মানুষ এ স্থানের পাশ দিয়ে চলাচল করে। তারাও উদ্যানে কিছুটা ফুরসত পেতে পারে। উদ্যান মানেই তো সেখানে থাকবে নানা প্রজাতির গাছগাছালি, থাকবে উদ্যান ও প্রাণিকুল। ক্লান্ত পথিক কিংবা নগরবাসী সেখানে নিঃশ্বাস নিতে পারবেন। প্রাকৃতিক নিয়মেই সেটা গড়ে ওঠা সময়ের ব্যাপার। তারপরও জিপিও স্থানান্তরসাপেক্ষে যত দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া যায়, ততই মঙ্গল। তবে আমরা চাইব, উদ্যানের পাশাপাশি সেখানে এমন একটি স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করা হোক, যার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম জানবে যে, এখানে একসময় ডাকঘর ছিল। সোহওয়ার্দী উদ্যানে যেমন স্থাপন করা হয়েছে স্বাধীনতা স্তম্ভ। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছেন, যেখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে- সে স্থানটির গুরুত্ব ঐতিহাসিকতা ধারণ করে আছে স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভ। এ রকম কোনো স্মারকও সবুজ উদ্যানে শোভা পেতে পারে। বলা বাহুল্য, জিপিও নতুন স্থানে যাচ্ছে। ৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ ডাক অধিদপ্তরের সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় আগারগাঁওয়ে ডাক বিভাগের প্রধান কার্যালয় নির্মিত হয়েছে। সেখানে বহুতল ভবনে নতুনভাবে বাংলাদেশের প্রধান ডাকঘরের কাজ শুরু হবে। আমরা চাইব, কেবল অবকাঠামোগত উন্নতিই নয়, বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবার মানও বাড়বে। সমকালের প্রতিবেদনসূত্রে পরিকল্পনামন্ত্রীর তরফে জানা যাচ্ছে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাক বিভাগকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। ডিজিটাল ও অনলাইন আর্থিক সেবা ছাড়াও ডাক বিভাগকে পণ্য পরিবহনে পর্যাপ্ত যানবাহন, পচনশীল পণ্য রাখার ব্যবস্থা ও পণ্য সংরক্ষণের কথাও প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন। তার মানে ডাক বিভাগের চ্যালেঞ্জগুলো সবারই জানা। যদিও ডাক বিভাগকে আমরা একটু ঝিমিয়ে যেতে দেখেছি। এটা ঠিক, যুগের পরিবর্তনে হয়তো চিঠি লেখার আবেদন কমে গেছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটের কারণে ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য মানুষকে ডাকের দ্বারস্থ হতে হয় না। কিন্তু এটাও ঠিক, অফিসিয়াল যোগাযোগে কিংবা নানা প্রয়োজনে ডকুমেন্ট পাঠানোর প্রয়োজন কমেনি, কমেনি বইপত্র ইত্যাদি পার্সেলও। প্রাইভেট কুরিয়ার সার্ভিস যেখানে ব্যবসা করে যাচ্ছে, সেখানে ডাক বিভাগেরও লোকসানের কারণ থাকতে পারে না। উন্নত বিশ্বের ডাক বিভাগ যেখানে সুন্দরভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমাদের পিছিয়ে থাকার কারণ নেই। আমরা জানি, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গত কয়েক বছর ধরে আমাদের ডাক বিভাগও সেবার নানা দিগন্ত প্রসারিত করেছে। এখন নতুন ভবন, সেখানে অন্য মাত্রা যোগ করবে নিশ্চয়ই। সবুজ উদ্যানের সঙ্গে সঙ্গে একটি সজীব জিপিও যে আমরা চাই।