বিচারের বাণী কাঁদে না নিভৃতে

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে- রবীন্দ্রনাথের 'প্রশ্ন' কবিতার এই চরণ আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। একই সঙ্গে বহু পুরনো আর একটি সত্য কথাও স্মরণযোগ্য, 'জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড।' অর্থাৎ বিচারকাজ যত বিলম্বিত হবে, ন্যায়বিচার ততটাই ব্যাহত হবে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের বিচারাঙ্গনে কখনও কখনও যে উপলব্ধি হয়েছে, তা স্মরণযোগ্য। আদালত প্রাঙ্গণে 'আমি বাঁচতে চাই না, মরতে চাই' আর্তি নিয়ে আসা শতবর্ষী রাবেয়া খাতুনের ক্ষেত্রে তা যেন আরেকবার প্রমাণ হলো। ২৫ এপ্রিল সমকালে 'অশীতিপর রাবেয়া :আদালতের বারান্দায় আর কত ঘুরবেন তিনি' শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি যুক্ত করে আইনজীবী মো. আশরাফুল আলম ২৮ এপ্রিল হাইকোর্টে একটি আবেদন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট রাবেয়া খাতুনের বিরুদ্ধে থাকা মামলাটির কার্যক্রম কেন স্থগিত হবে না, তা জানতে রুল জারির পাশাপাশি নিম্ন আদালতে থাকা নথি তলব করেন। আদালত মামলাটির কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং এই মামলার কার্যক্রম পরিচালনার দায়ে ঢাকার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত ও মহানগর বিশেষ আদালতের বিচারককে তলব করেন। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশ, ৩ জুলাই উচ্চ আদালত কর্তৃক নির্ধারিত তারিখে বিচারক সংক্ষুব্ধ হাইকোর্টের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে আদালত তাকে আগামী ১৭ জুলাই এ বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং ওই দিনই এ মামলায় জারি করা রুলের শুনানির তারিখও নির্ধারণ করেন।

অবৈধ অস্ত্র ও গুলি নিজ হেফাজতে রাখার অপরাধে ঢাকার তেজগাঁও থানার এসআই আবদুর রাজ্জাক বাদী হয়ে অশীতিপর রাবেয়া খাতুনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিলেন ২০০২ সালের জুন মাসে। এরপর তিনি গ্রেফতার হন। ৬ মাস কারাগারে থেকে জামিনও পান। পরে তাকেসহ অন্য দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ২০০৩ সালের মার্চ মাসে শুরু হয় মামলার বিচার। সংক্ষুব্ধ হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থগিতাদেশের পরও বিচারিক আদালতের রেকর্ডে মামলাটি সাক্ষ্যের জন্য রাখায় হাইকোর্টের আদেশকে অবজ্ঞা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। আলোচ্য বিচারকের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালত যথার্থই বলেছেন, আপনারা বিচার বিভাগের অংশ। আপনাদের সুনাম মানে বিচার বিভাগের সুনাম। সর্বোচ্চ আদালতের তরফে এসব পর্যবেক্ষণ এবং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আমরা স্বস্তি-সন্তোষ প্রকাশ করি। দুর্বল বা সবলই হোন, যে কোনো বিচারপ্রার্থীই যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন- এটাই জনপ্রত্যাশা। আমাদের উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে নিম্ন আদালত পর্যন্ত মামলাজটের কারণ, প্রেক্ষাপট ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন মানুষ মাত্রেরই কমবেশি জানা। আবার অনেক মামলা শুনানির জন্য তালিকাভুক্তই হয়নি, বিনা বিচারে কারাভোগ ইত্যাদি দৃষ্টান্তও আছে। আমাদের মনে আছে, সেই তিন বছর কারারুদ্ধ জাহালমের কথা, যাকে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত প্রক্রিয়ার ভুলত্রুটি নির্ণয় করে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছিলেন। পুলিশ বা অন্যান্য তদন্ত সংস্থার কারণে অতীতেও এমন দুঃখজনক ঘটনা অনেক ঘটেছে। বহু নির্দোষ মানুষ বছরের পর বছর কারাভোগ করেছে। আবার বহু মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় ভোগান্তি প্রকট রূপ নিয়েছে। রাবেয়া খাতুন এরই সর্বশেষ দৃষ্টান্ত।

আমরা জানি, বিচারব্যবস্থা রাষ্ট্রের চারটি স্তম্ভের অন্যতম একটি। রাষ্ট্রের নাগরিকদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব যেমন বিচার বিভাগের, তেমনি বিচার বিভাগকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্র এবং সংশ্নিষ্ট সব মহলের। বিলম্বিত বিচার কিংবা বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে আমাদের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব সমস্যা নতুন নয়। হাইকোর্ট বেঞ্চ রাবেয়া খাতুনের মামলার ব্যাপারে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তাতে এটিই যেন প্রমাণ হলো- বিচারের বাণী কাঁদে না নিভৃতে।